অ্যামাজন জঙ্গলের বিস্ময়কর কিছু তথ্য

শেয়ার করুণ

Share on facebook
Share on twitter
Share on pinterest

অ্যামাজন বনাঞ্চল শুধু পৃথিবীর বৃহত্তম বনাঞ্চলই না, জীববৈচিত্র্যের ঘনত্বের  বিচারেও শীর্ষস্থান অধিকারী। অর্থাৎ এই বনে প্রতি বর্গমিটারে যে সকল প্রাণীও ও উদ্ভিদ রয়েছে তা আর অন্য কোথাও চোখে পরবেনা। এ বনের মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম নদী। এটি আয়তনে এতো বড় যে রাজনৈতিক ভাবে নিয়ন্ত্রন রয়েছে নয়টি দেশের। আজ আপনাদের জানাবো অ্যামাজন জঙ্গলের বিস্ময়কর কিছু তথ্য।

বিজ্ঞানীদের গবেষণা অনুযায়ী এ জঙ্গলের সৃষ্টি হয়েছিল আনুমানিক সাড়ে পাঁচ কোটি বছর আগে। এর আগে পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠের টেকটনিক প্লেটের চলনের ফলে আফ্রিকা এবং দক্ষিন আমেরিকা এ দুটো ভূখণ্ডের মধ্যে দুরুত্ব বাড়তে থাকে। দুই মহাদেশের দূরবর্তী আটলান্টিক মহাসাগরের আয়তন ও একই সাথে বৃদ্ধি পায়।

এই সময় পৃথিবীর ক্রান্তীয় এলাকার তাপমাত্রা এবং সেখানে বৃষ্টিপাতের পরিমান ও বেড়ে যায়। যার ফলে  অ্যামাজন নদীর অববাহিকায় বিশাল এই বনানঞ্চলের সৃষ্টি হয়। সূচনালগ্ন থেকে পরিপূর্ণ  অ্যামাজন হতে সময় লেগেছিল প্রায় দুই কোটি বছর। বানিজ্যিক কারনে বনাঞ্চল ধ্বংস শুরুর আগে দক্ষিণ আমেরিকার পুরো পূর্ব উপকূল জুড়ে এই জঙ্গলের বিস্তৃতি ছিল। 

আনুষ্ঠানিক ভাবে এই জঙ্গলের বর্তমান আয়তন প্রায় ৫৫ লাখ বর্গকিলোমিটার বা ২১ লাখ বর্গমাইল। অর্থাৎ আয়তনে এটি আমাদের ৪০টি বাংলাদেশের সমান। এটি যদি একক কোন রাষ্ট্র হতো তবে আয়তোণে বিশ্বে ৯ম দেশ হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করতো। 

যেমনটি আমরা সবাই জানি অ্যামাজন পৃথিবীর সর্ববৃহৎ বনাঞ্চল কিন্তু আরেকটু নিখুত ভাবে বললে একে বলতে হবে এটি পৃথিবীর সর্ববৃহৎ  ট্রপিক্যাল রেইন ফরেস্ট বা ক্রান্তীয় বর্ষা প্রবন বনাঞ্চল। 

সাধারনত অ্যামাজন জঙ্গলের নাম শুনলে আমাদের সবার চোখের সামনে ব্রাজিল দেশটির কথা ভেসে আসে। কিন্তু এর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ মূলত নয়টি দেশের হাতে রয়েছে । যদিও এই জঙ্গলটির প্রায় ৬০ ভাগ অঞ্চল বিদ্যমান ব্রাজিলের ভিতর।

এছাড়া পেরুর কাছে রয়েছে বনাঞ্চলের ১৩ভাগ, বলিভিয়ার রয়েছে ৮ ভাগ, কলোম্বিয়ার রয়েছে ৭ ভাগ, ভেনিজুয়েলার আছে ৬ ভাগ, গায়নার রয়েছে ৩ ভাগ, সুরিনামের রয়েছে  ২.৫ ভাগ, ফ্রেঞ্চ গায়ানার রয়েছে ১.৪ ভাগ এবং ইকুয়েডরের রয়েছে শতকরা ১ ভাগ। 

বৃহত্তম এই বনাঞ্চলের ভিতর বুক চিরে বয়েছে চলেছে বিশ্বের বৃহত্তম নদী গুলোর একটি। প্রায় ৭ হাজার দৈর্ঘ্য বিশিষ্ট অ্যামাজন নদী পৃথিবীর বৃহত্তম নদীর তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। নীল নদ অ্যামাজন নদীর চেয়ে বড় হলেও পানি প্রবাহের দিক থেকে অ্যামাজনের ধারে কাছেও কোন নদী নেই।  

এই নদীর মোহনা দিয়ে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ২১ কোটি লিটার পানি আটলান্টিক মহাসাগরে গিয়ে পরে। বৃহত্তম নদীর তালিকায় পরের সাতটি নদীর মোট জল প্রবাহ এর থেকেও কম! পৃথিবীর সব গুলো নদীর মোহনায় যে পরিমান পানি প্রতিদিন সাগর বা মহাসাগরে মেশে তার পাঁচ ভাগের এক ভাগই এই অ্যামাজন নদীর মোহনা দিয়ে প্রবাহিত হয়। 

শুধু তাই না এই অ্যামাজন নদীর অববাহিকাও আয়তনের দিক থেকে বিশ্বের বৃহত্তম। এর আয়তন ৭০ লাখ বর্গকিলোমিটারের ও বেশি। এই নদীর আরেকটি বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এর উৎপত্তি প্রশান্ত মহাসারের কয়েকশ কিলোমিটের মধ্যে অবস্থিত আন্দিজ পর্বত মালায় হয়েছে। অথচ এটি প্রশান্ত মহাসাগরে মিলিত হবার বদলে প্রায় ৭ হাজার কিলোমিটার ঘুরে আটলান্টিক মহাসাগরে মিশেছে। 

দীর্ঘ এই খরস্রোতা নদী পার হয়ে রেকর্ড গড়েছেন মার্কিন সাতারু মার্টিন স্রেল। ২০০৭ সালে তিনি অ্যামাজন নদীর উৎপত্তি স্থল থেকে শুরুর করে মোহনা পর্যন্ত সাতরে অতিক্রম করেন। এর জন্য তাকে প্রতিদিন ১০ ঘন্টা করে টানা ৬০ দিন সাতার কাটতে হয়েছিল। 

বৃহত্তম এ বনভূমিতে প্রাণীকুলের সংখ্যাও অবাক করার মতো। এখন পর্যন্ত এই বনাঞ্চল পুরোটা ঘুরে দেখা হয়নি জীব বিজ্ঞানীদের। যতটুকু তারা আবিস্কার করতে পেরেছেন তার ভিতর ৪০ হাজার প্রজাটির প্রাণী খুঁজে পেয়েছেন তারা। এখানে বিজ্ঞানীরা খুঁজে পেয়েছেন দেড় হাজার প্রজাটির নতুন পাখি।

এর ভিতরে স্কার্লেট ম্যাকাউ পাখিটিকে বলা হয় বিশ্বের অন্যতম সুন্দর পাখি গুলোর একটি। আকাশে নীল লাল হলুদ রঙ্গের পাখি গুলো উড়তে দেখলে আপনার মনে হবে যেন উড়ন্ত রংধনু দেখতে পাচ্ছেন। 

আরও আছে হার্পি ঈগল। যারা সুযোগ পেলে মানুষের বাচ্চাও শিকার করতে সক্ষম। গাছের ডাল ও মাটিতে বিচরন করে প্রায় ৫০০ প্রজাটির স্তন্যপায়ি প্রাণী। এর ভিতর বানর এবং জাগুয়ার বাঘের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রাপ্ত বয়স্ক জাগুয়ার রীতিমত নদীতে নেমে কুমির শিকার করে খায়। 

জঙ্গলের মাঝে বয়ে যাওয়া নদীতে রয়েছে প্রায় ৩হাজার প্রজাতির মাছ। এর ভিতরে পিরানহার মতো মাংসাশী মাছ মুভির কল্যানে কিংবদন্তীর মতো মর্যাদা পেয়েছে। পিরানহার মতো না হলেও পিরাকুকু মাছও বিভীষিকা সৃষ্টিতে কম যায়না। এই মাছ গুলো সর্বনিম্ন ৩মিটার থেকে ১০ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়। 

উভচর প্রাণীর মধ্যে পয়জন ডার্ক ফ্রগ উল্লেখযোগ্য। সোনালি, সবুজ, নীল রঙ্গের টকটকা লাল ব্যাং গুলোর ত্বক থেকে প্রচুর বিষাক্ত এক ধরনের পদার্থ নিঃসৃত হয়। এই ব্যাং থেকে বিষ সংগ্রহ করে শিকারের কাজে ব্যাবহার করে অ্যামাজনের বিভিন্য আদিবাসী গোত্রের সদস্যরা। 

টেকটনিক প্লেটের চলনের কারনে আফ্রিকা এবং দক্ষিন আমেরিকার ভূখণ্ড দুটো আলাদা হয়ে গেছে কয়েক কোটি বছর আগে। কিন্তু এ দুটো মহাদেশের ভিতর এক অনন্য প্রাকৃতিক সম্পর্ক বহাল আছে এখনো। আফ্রিকার সাহার মরুভূমি থেকে প্রতিবছর বিপুল পরিমান বালি আটলান্টিক মহাসাগর পেরিয়ে অ্যামাজন নদীর অববাহিকায় গিয়ে পরে। এ বালির বড় একটি অংশ মূলত ফসফরাস। যা উদ্ভিদের বৃদ্ধিতে সক্রিয় ভুমিকা পালন করে।

নাসার ক্যালিপসো স্যাটালাইট থেকে ধারণকৃত চিত্র অনুযায়ী প্রতিবছর ধুলি ঝড়ে সাহারা মরুভূমি থেকে ১৮ কোটি ২০ লাখ টন বালি উড়ে যায়। এ বালি বাতাসে ভেসে আটলান্টিক মহাসাগরের উপর দিয়ে ২হাজার ৬শ কিলোমিটার পারি দেয়। এর মাঝে কিছু বালি সাগরে পরলেও প্রায় ২ কোটি ৭৭লাখ টন বালি অ্যামাজন জঙ্গলের মাটিতে এসে পৌছায়। যার ভিতর ২ কোটি ২০ লাখ টন ই ফসফরাস। 

বিস্ময়কর ব্যাপার হল অ্যামাজন জঙ্গলের উর্বরতা বৃদ্ধিকারি প্রাকৃতিক সারের শতকরা ৫৬ ভাগই আসে সাহারা মরুভুমির একটি এলাকা থেকে। প্রত্নতাত্ত্বিকদের হিসেবে অ্যামাজন জঙ্গল সংলগ্ন এলাকায় মানুষের বসতি শুরু হয় এখন থেকে প্রায় সাড়ে এগারো হাজার বছর আগে। এরপর প্রায় ১০হাজার বছর উত্তর এবং দক্ষিন আমেরিকার সম্পর্কে ইউরোপ , এশিয়া , আফ্রিকা অধিবাসীদের কোণ ধারনাই ছিল না।

এই অজ্ঞতার অবসান ঘটে পঞ্চদশ শতকে যখন ক্রিস্টোফার কলম্বাস আমেরিকায় পদার্পণ করেন। সেসময় অ্যামাজন সংলগ্ন এলাকায় ৫০লাখ মানুষ বসবাস করতো। এরপর স্প্যানিশ ঔপনিবেশিকদের হাতে অ্যামাজনের আদিবাসীদের  নির্মূল করার কাহিনী সবারই জানা। তার আগে আদিবাসীদের সংস্কৃতি ছিল যেমন বনেদী তেমনই জাঁকজমকপূর্ণ। 

একবিংশ শতাব্দীতে বিজ্ঞানীরা অ্যামাজন জঙ্গলে এমন কিছু স্থাপনা খুঁজে পান খ্রিস্টাব্দ প্রথম শতকের দিকে নির্মিত বলে ধারনা করা হচ্ছে।

এখনো এখানে ৫০০ আদিবাসী গোত্রের বসবাস আছে বলে ধারনা করা হয়। সমাজ বিজ্ঞানীদের ভাষা অনুযায়ী ভাষ্য অনুযায়ী এর মধ্যে অন্তত ৫০টি গোত্রের সদস্যরা এখন পর্যন্ত কোন সভ্যতার মুখোমুখি হননি। 

অ্যামাজন জঙ্গলে প্রতিবছর ১২০ ইঞ্চি বা ১০ফুট পর্যন্ত বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। তবে কোথাও কোথাও তা ৪০০ ইঞ্চি বা ৩৩ফুট ও ছাড়িয়ে যায়। এখানে বিদ্যমান চার কোটি গাছের ডালাপালা এতোটাই বিদ্যমান যে বৃষ্টির পানি মাটিতে পৌছতে লেগে যায় প্রায় ১০ মিনিট!! 

ডালাপালার এতো ঘনত্বের কারনে অ্যামাজনের মাটিতে সূর্যের এক ভাগের বেশি আলো মাটিতে পৌছেয়না। 

বিশ্বের বৃহত্তম এ জঙ্গল বাণিজ্যিক কারনে নির্বিচারে ধ্বংস করা হচ্ছে। ২০১৮ সাল নাগাদ বিজ্ঞানীদের হিসেবে অ্যামাজন জঙ্গলের প্রায় ১৭ভাগ এলাকা উজাড় হয়ে গেছে। তাদের আশংকা এর পরিমান ২৫ ভাগ হয়ে গেলেই এটি বনাঞ্চল থেকে তৃণভূমিতে পরিনত হয়ে যাবে। যার কারনে বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে প্রাণীদের বিরাট একটি অংশ। বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী ১৯৯১ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ২লাখ বর্গকিলোমিটারের বনাঞ্চল উজাড় করা হয়েছে। এই জায়গাগুলো সরকারি এবং ব্যাক্তিগত পর্যায়ে গবাদি পশুর খামার হিসেবে ব্যাবহিত হচ্ছে। বাণিজ্যিক ভাবে এটি সাময়িক লাভ স্বরুপ হলেও পরিবেশের জন্য এটি ব্যাপক হুমকি হিসেবে দাঁড়িয়েছে। 

Subscribe to our Newsletter

সম্পর্কিত আরো লেখা সমূহ