ইতিহাসের ভয়ংকর ৫টি মহামারী

শেয়ার করুণ

Share on facebook
Share on twitter
Share on pinterest

যখন কোনো রোগ বিশ্বের বিরাট অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং অস্বাভাবিক সংখ্যায় মানুষ আক্রান্ত হয় এবং মারা যায় তখন তাকে মহামারি বলা হয়ে থাকে। নতুন এই ভাইরাস খুব সহজেই একজন থেকে অন্যজনের শরীরে সংক্রমণ ঘটায়।

আর নতুন হওয়ার কারণ মানুষের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা এ ভাইরাসের বিরুদ্ধে কোনো কাজে আসে না এবং তাৎক্ষণিকভাবে এর চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে বিভ্রান্তিতে থাকেন বিজ্ঞানীরা।

আজ আমরা ইতিহাসের ভয়ংকর ৫টি মহামারী সম্পর্কে জানবো।

স্প্যানিশ ফ্লু

স্প্যানিশ ফ্লু মহামারি চলাকালে যুক্তরাষ্ট্রে রেডক্রস মোটর কর্পসের টিম। এবং তাদের পেছনে অ্যাম্বুলেন্স।

১৯১৮ সালের শেষের দিকে ভয়ঙ্কর এক মহামারি সারা বিশ্ব দাপিয়ে বেড়াচ্ছিল। ওই মহামারির নাম ছিল স্প্যানিশ ইনফ্লুয়েঞ্জা।

মানব ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাণঘাতী ঐ মহামারীতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছিল পাঁচ কোটিরও বেশি মানুষের। এই সংখ্যা ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধে নিহত মানুষের সংখ্যার চাইতেও বেশি।

ঐ সময়ে সারা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার এক চতুর্থাংশেরই মৃত্যু হয়েছিল এই ভাইরাসে।

তবে এর নাম স্প্যানিশ ফ্লু হলেও এর উৎপত্তি ছিল মূলত এমেরিকা। স্প্যানিশ ফ্লু নামকরণের পেছনে কারণ হলো স্পেনের সংবাদ মাধ্যম এই ফ্লুর খবরটি মুক্তভাবে পরিবেশন করছিল।

রোগটি এতটাই ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল যে মৃতদেহ দাফনের জন্য কোণ গির্জা কিংবা যাজক পাওয়া যাচ্ছিল না। কবর খোড়ার মতো লোক পাওয়া ছিল দুষ্কর ব্যাপার।

কলেরা

শিল্পীর তুলিতে কলেরা মহামারীর চিত্র

কলেরা মহামারী প্রথম ধরা পড়েছিল থাইল্যান্ডে ১৮২০ সালে। ভারত, ইন্দোনেশিয়া এবং ফিলিপাইনে সহ এশিয়ার দেশগুলিতে ছড়িয়ে পড়েছিল এই মহামারী।

এই কলেরা দিয়েই প্রথম মহামারি দেখে এশিয়া। ঠিক কতোজন এই মহামারিতে প্রাণ হারিয়েছিলেন, তার সঠিক পরিসংখ্যান আজও মেলেনি। তবে ১৮২০ সালে এই জীবাণুটির কারণে এশিয়ায় ১ লাখের বেশি মানুষের মৃত্যুর রেকর্ড করা হয়েছিল।

দূষিত নদীর পানি খাওয়ার কারণে কলেরা মহামারী শুরু হয়েছিল বলে জানা যায়।

দ্য প্লেগ অব জাস্টিনিয়ান

দ্য প্লেগ অব জাস্টিনিয়ান যাতে দৈনিক গড়ে মারা যেত ৫ হাজার মানুষ

বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের অন্যতম প্রভাবশালী সম্রাট জাস্টিনিয়ান অতীতের রোমান সাম্রাজ্যের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনার জন্য যেসব অভিযান চালিয়েছিলেন, সেগুলোর জন্য ইতিহাসে তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন সত্য।

তবে তিনি বেশি স্বরনিয় হয়ে থাকবেন তার শাসনামলে ঘটে যাওয়া প্লেগ নামক এক মহামারীর জন্য। ৫৪০-৫৪১ খ্রিষ্টাব্দের দিকে মিশরে এই রোগের উৎপত্তি ঘটে।

এই রোগের উৎস এবং বাহক হচ্ছে ইদুর। তৎকালীন সময়ে মিশর ছিল সমগ্র ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের খাদ্যশস্যের জোগান। ফলে এখানে সৃষ্ট রোগ খুব সহজেই পূর্ব থেকে পশ্চিমে ছড়িয়ে যায়।

এই ভাইরাসের প্রথম আক্রমণটা ছিল বাইজান্টাইনের রাজধানী কনস্টান্টিনোপলে (বর্তমান ইস্তাম্বুল)।

ইতিহাসবিদরা ধারনা করেন এই মহামারীর চূড়ান্ত পর্যায়ে সেখানে প্রতিদিন গড়ে ৫ হাজার মানুষ মারা যেত!

প্রায় ৫০ বছর টিকে থাকা এই মহামারীতে আড়াই কোটি মানুষে মারা যায়। তবে কিছু কিছু উৎসে সংখ্যাটা ১০ কোটিতেও ঠেকেছে।

প্রাচীন পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ানক এ মহামারীই ইউরোপে ‘ডার্ক এজ’র সূচনা করেছিল।

এইচআইভি/এইডস

স্ক্যানিং ইলেক্ট্রন মাইক্রোগ্রাফে পর্যবেক্ষিত লিম্ফোসাইট থেকে অঙ্কুরিত সবুজ বর্ণের এইচআইভি-১

মানবসভ্যতাকে আজ যে-কটি রোগ হুমকির সম্মুখীন করে তুলেছে, এইচআইভি/এইডস সেগুলোর মধ্যে একটি। এটি একাধারে একটি মারণ এবং সংক্রামক ব্যাধি।

এই নীরব ঘাতকের জন্ম কোথায় এবং কিভাবে তা নিয়ে এখনো বিজ্ঞানীদের মধ্যে চলছে বিতর্ক।

তবে গবেষণা করে মোটামুটি একটা সিদ্ধান্তে আসা গেছে যে, পঞ্চাশের দশকে আফ্রিকার প্রত্যন্ত অঞ্চলে দরিদ্র কৃষক শ্রেণির মধ্যে প্রথম এ রোগ বিস্তার লাভ করে।

এরপর ষাট ও সত্তরের দশকে পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলেও কিছু কিছু এইডসের জীবাণু ছড়িয়ে পড়ে।

কোনো-কোনো গবেষকের মতে মধ্য আফ্রিকার এক প্রকারের সবুজ বানরের দেহে সর্বপ্রথম এইডস বা এইচআইভি ভাইরাসের উপস্থিতি দেখা যায়।

১৯৮০ সালে সর্বপ্রথম এ ঘাতক রোগটি শনাক্ত করা হয়।

Names of people who have died of AIDS on the Circle of Friends Memorial (2009). Justin Sullivan/Getty Images News

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে এইডসের উৎপত্তি থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩২ মিলিয়ন মানুষ মারা গিয়েছেন এই রোগে।

ইউনিসেফের ভাষ্যমতে এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালে এইডসে আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন গড়ে ৮০ জন কিশোর-কিশোরী মারা যাবেন।

ইবোলা

ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে দৃশ্যমান ইবোলা ভাইরাসের ভিরিয়ন

মুর্তিমান আতংক হয়ে আফ্রিকা দাপিয়ে বেড়ান এই ভাইরাসটির নামকরন করা হয় বর্তমানের দক্ষিণ সুদান ও অন্যটি গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গোর (তৎকালীন জায়ারে) ইয়ামবুকু গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে চলা ইবোলা নদীর নামে।

১৯৭৬ সালে দক্ষিণ সুদান ও গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গোতে মানুষ একইসাথে ইবোলা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়। তখন এই ভাইরাসটি বিজ্ঞানীদের নজরে আসে

দক্ষিণ সুদানে রোগাক্রান্ত মানুষের অর্ধেকের বেশি মৃত্যুবরন করেছিলেন। ইয়ামবুকু গ্রামে মৃত্যুর হার ছিল আরো ভয়াবহ। সেখানে আক্রান্ত একশজনের ভিতর ৮৮ জনেরই মৃত্যু হয়।

এই রোগের বাহক হিসেবে ধরা হয়ে থাকে বাদুড় কে।

এই ভাইরাস কয়েক দফায় মানবজাতিকে সংক্রমন করে। ২০১৩ থেকে ২০১৫ সালে এ ভাইরাস পশ্চিম আফ্রিকায় মহামারি আকার ধারণ করে।

২০১৯ সালে আবারো ইবোলা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হওয়ায়, স্বাস্থ্যগত বৈশ্বিক জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

Subscribe to our Newsletter

সম্পর্কিত আরো লেখা সমূহ