করোণা ও মধ্যবিত্তর সংগ্রামের গল্প

শেয়ার করুণ

Share on facebook
Share on twitter
Share on pinterest

করোনা পরিস্থিতিতে সবচেয়ে সংকটে আছে দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণি। এই দুর্যোগপূর্ণ সময়ে সামাজিক অবস্থান, মানবিক মূল্যবোধ, আধুনিক ধ্যানধারণা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থানসহ অন্য বিষয়গুলোর কারণে মুখফুটে তারা বলতে পারছে না তাদের অসহায়ত্বের কথা। অথচ সমাজের বড় একটি জনগোষ্ঠী মধ্যবিত্ত। এই আপদকালিন সময়ে গরিবের জন্য আছে খাদ্য ও অর্থ সহায়তা৷ উচ্চবিত্তের জন্য আছে শিল্পের প্রণোদনা৷ কিন্তু মধ্যবিত্তের জন্য কী আছে?

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের গবেষণায় বলা হয়েছে, করোনার প্রভাবে চাকরি হারিয়েছেন ৩৬ শতাংশ মানুষ। আর ৩ শতাংশের চাকরি থাকলেও বেতন পান না। এদের বড় অংশই মধ্যবিত্ত। এছাড়া বিদেশে কর্মরত কয়েক লাখ প্রবাসী কর্মী কাজ হারিয়েছেন।

বেসরকারি সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের এক গবেষণায় দেখা গেছে, লকডাউনের ফলে প্রায় এক কোটি ৯০ লাখ পরিবার ভঙ্গুর জনগোষ্ঠীর মধ্যে পড়বে।

সংস্থাটি বলছে, এই পরিস্থিতির কারণে দারিদ্র সীমার ঠিক ওপরে যারা আছেন, অর্থাৎ নিম্ন মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী, তারাও দারিদ্রসীমার মধ্যে পড়ে যাবে বর্তমান অবস্থার কারণে।

অপরদিকে বিআইডিএস-এর সাম্প্রতিক জরিপে বলা হচ্ছে, করোনায় এক কোটি ৬৪ লাখ মানুষ নতুন করে গরিব হয়েছে, নেমে গেছে দারিদ্র্য সীমার নীচে ৷ তাই এখন দেশে গরিব মানুষের সংখ্যা পাঁচ কোটির বেশি৷ 

যদি আমরা বিআইডিএসের জরিপের কথাই ধরি তাহলে, এই যে দেড় কোটি লোক নতুন করে দরিদ্র হলেন, তারা কি মধ্যবিত্ত ছিলেন? চট করে এর জবাব দেয়া কঠিন৷ দারিদ্র্য সীমার একটু উপরে একটি বড় জনগোষ্ঠী আছে৷ যারা যে কোনো দুর্যোগ-দুর্বিপাকে দরিদ্র হয়ে যান৷ আবার পরে পরিস্থিতি কটিয়ে ওঠেন৷ 

মধ্যবিত্তর সংজ্ঞা কি?

দেশের প্রচলিত আইনে মধ্যবিত্তের কোনো সংজ্ঞা নেই। গত ৪৮ বছরেও বাংলাদেশে মধ্যবিত্তের সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়নি। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস), এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) বিচ্ছিন্নভাবে মধ্যবিত্ত নিয়ে গবেষণা করার চেষ্টা করেছে, তবে তা কেবলই আর্থিক পরিমাপ দিয়ে। 

অর্থনীতিবিদ ও সমাজ বিশ্লেষকরা বলছেন, একজন মানুষ দৈনিক ২,১২২ কিলোক্যালরির কম খাদ্য গ্রহণ করলে কিংবা দৈনিক আয় ১ দশমিক ৯২ ডলারের কম হলে তাকে দরিদ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। দারিদ্র্যসীমার এই সংজ্ঞা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। তাহলে মধ্যবিত্তের আয়সীমা কতো?

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বলছে, এক ব্যক্তির ক্রয় ক্ষমতা (পিপিপি) যদি প্রতিদিন দুই মার্কিন ডলার থেকে ২০ মার্কিন ডলারের মধ্যে হয় তাহলে তাকে মধ্যবিত্ত বলা যায়৷ এই হিসেবে তারা বলছে, বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত হলো তিন কোটি ৭ লাখ।

বিশ্বব্যাংকের মধ্যবিত্তের আয়ের হিসেবটি একটু বেশি৷ যাদের প্রতিদিন আয় ১০ থেকে ৫০ ডলার, তারা মধ্যবিত্ত৷

এমন পরিস্থিতিতে কিভাবে চলছেন দেশের কয়েক কোটি মধ্যবিত্ত?

মধ্যবিত্তের কিছু সঞ্চয় থাকে৷ তারা মূলত এই লকডাউনে সেই সঞ্চয় ভেঙে খেয়েছেন৷ এভাবে কয়েকমাস বা দিন কাটিয়ে তারা তাদের পুরো সঞ্চয়ের টাকা শেষ করে ফেলেছেন। এখন আর তাদের সঞ্চয় বলতে কিছুই নেই। 

যদি সবকিছু স্বাভাবিক হয় তখন কি পরিস্থিতি দাঁড়াবে? তখন বিপুল সংখ্যক মধ্যবিত্ত পরবেন দারিদ্রসীমার গ্যারাকলে৷ সবচেয়ে বড় সংকট হবে যখন সবকিছু স্বাভাবিক হবে কিন্তু বিপুল সংখ্যক মানুষ চাকুরি থাকবেনা। 

ইতিমধ্যে আয় উপার্জন হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পরেছে মানুষ। শহরের নিত্য ব্যয়ভার বহন করতে না পেরে বাধ্য হয়ে গ্রামে ফিরে যাচ্ছেন হাজারও কর্মহীন মানুষ। তারা ফিরছেন একেবারে নিঃস্ব হয়ে। প্রতিদিনই রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে দেখা যায়, মালপত্র ভর্তি বাহনে করে ঢাকা ছাড়ছে মানুষ। তাদের মধ্যে কেউ দিনমজুর, কেউ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কেউ গার্মেন্টস শ্রমিক, ছাত্র-প্রাইভেট শিক্ষক ও বিভিন্ন পেশার মানুষ। 

সন্তানদের স্কুলের খরচ, বাসাভাড়াসহ শহরে থাকার খরচ সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলেই মধ্যবিত্তরা গ্রামে চলে যাচ্ছে অথবা পরিবারকে গ্রামে পাঠিয়ে দিচ্ছে। এমনকি যারা শহরতলীতে থাকতো তারাও সেসব এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছে। ঢাকা শহরের বাড়িওয়ালা বাড়িভাড়া তো মওকুফ করবে না! মাস ফুরালেই ভাড়ার তাগিদ দেবে। না দিতে পারলে অপমান করবে। সুতরাং ইজ্জত যাওয়ার আগে ইজ্জত বাঁচানোর ব্যবস্থাই উত্তম।

সাধারণত দেখাযায় যে, মধ্যবিত্তরা গ্রাম থেকে শহরে আসে। আয় রোজগার করে জীবন পরিচালনা করে। তারা তাদের সন্তানদের শহরের ভালো স্কুলে শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করে। কারণ গ্রাম-গঞ্জের স্কুলে শিক্ষার যে বেহাল অবস্থা, তাতে সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে সবাই চিন্তিত। 

উল্লেখ্য, রাজধানীতে ভাড়া বাসায় থাকেন প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ। তাদের বেশিরভাগই মধ্যবিত্তের পর্যায়ে পড়েন।

আবার কেওবা কোনরকম খড়কুটো আঁকড়ে ধরে পরে আছেন শহরে হয়তো উপার্জনের একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে এই আশায়। 

ইতমধ্যে বিভিন্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, দোকান, রেস্তোরা খুললেও দোকানিরা বলছেন, লকডাউনের কয়েক ঘণ্টার সময়সীমার মধ্যে যেটুকু বিক্রি হয়েছে, এখন দোকানপাট  দীর্ঘ সময় খোলা থাকলেও বেচাকেনা কম। সন্তোষজনক বিক্রি না হওয়ায় অন্যান্য পণ্যের দোকানদারদের মধ্যেও ব্যাপক হতাশা।

অনেক দোকানি আবার ঠিকমতো দোকানই খুলছেন না। কর্মচারীর বেতন, দোকানভাড়া পরিশোধ করা দোকানদারের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। কেউ কর্মচারী বিদায় করে দিয়েছেন। পূর্বে যেখানে ছিল পাঁচ জন কর্মচারী, সেখানে দুই-তিন জন রাখা হচ্ছে।

অনেক দেশের সরকার করোনার মধ্যে জনগণকে নগদ টাকা সাহায্য দিচ্ছে। অনেক রাষ্ট্রে বাড়িভাড়া ৪০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে। বাসভাড়া কমিয়েছে, গ্যাস-পানি-বিদ্যুতের দাম কমিয়েছে।

আমরা ইউরোপের দুর্বল অর্থনীতির একটি দেশ গ্রিসের উদাহরণ দিতে পারি এই ক্ষেত্রে। করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা বাসাভাড়া ও দোকানভাড়া ৪০ শতাংশ কমিয়েছে। বাস এবং ট্রেন ভাড়া কমিয়েছে ২০ শতাংশ। ইলেকট্রিক/গ‍্যাস/পানি/পৌরসভার কর কমিয়েছে ২০ শতাংশ করে। খাদ্যের ওপর ভ্যাট ১৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে করেছে ৬ শতাংশ। তেলের দাম কমিয়েছে ৩০ শতাংশ।

মহামারিকালীন বেকার ভাতা চলমান রয়েছে ৮০০ থেকে ৫৩৪ ইউরো। ব‍্যবসায়ীদের জন্য রয়েছে ১ শতাংশ সুদের হারে ঋণ সহযোগিতা। এখানে শেষ নয়, গণমাধ্যমকে ইতিমধ্যে ৩০ মিলিয়ন ইউরো সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে।

আমাদের ব্যয় কমানো দূরের কথা বরং বাসভাড়া বেড়েছে, আগামী সেপ্টেম্বর মাস থেকে পানির দাম বাড়াচ্ছে ঢাকা ওয়াসা। বাজারের পণ্যের দাম বেড়েছে, অত্যধিক বিদ্যুৎ বিল নিয়ে ভোগান্তি বেড়েছে। তার সঙ্গে বাড়তি খরচ হিসেবে যোগ হয়েছে করোনা প্রতিরোধে মাস্ক, স্যানিটাইজার কেনা এবং চিকিৎসা ব্যয়। আর এসবের সবক’টির সরাসরি শিকার মধ্যবিত্ত।

দেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় অবদান মধ্যবিত্ত শ্রেণির। শুধু তাই নয়, তারা সমাজ বিনির্মাণে এবং সমাজকে টিকিয়ে রাখতে পালন করেন অগ্রণী ভূমিকা। এক কথায়, সমাজের সব ধরনের কর্মকাণ্ডে তাদের অংশগ্রহণই বেশি। তাই শুধু শিল্পের প্রণোদনা আর দরিদ্রদের সহায়তা দিলেই চলবেনা। একটি সমাজ ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে হলে এর পাশাপাশি মধ্যবিত্তদের জন্যও কিছু করার দ্বায় সরকারের অবশ্যই রয়েছে। 

Subscribe to our Newsletter

সম্পর্কিত আরো লেখা সমূহ