করোনাভাইরাসের উৎপত্তি, যেভাবে বিশ্বে ছড়িয়ে পরলো এবং প্রতিরোধের উপায়।

শেয়ার করুণ

Share on facebook
Share on twitter
Share on pinterest

করোনাভাইরাস যার আরেক নাম কোভিড- ১৯। করোনা থেকে ‘কো’, ভাইরাস থেকে ‘ভি’, এবং ‘ডিজিজ’ বা ‘রোগ’ থেকে ‘ডি’ নিয়ে এর সংক্ষিপ্ত নামকরণ করা হয়েছে কোভিড-১৯। চীন থেকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পরা এই ভাইরাসে এখন পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন ৩৩৪,৯৮১ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ১৪,৬৫২ জনের (২৪/০৩/২০২০)।

কোভিড- ১৯ কি?

করোনাভাইরাসের এক নতুন প্রজাতি হলো কোভিড- ১৯।  করোনাভাইরাসের কয়েক ধরণের প্রজাতি রয়েছে। তবে মানব দেহে সংক্রমিত হতে পারে এমন প্রজাতি রয়েছে ৭টি। কোভিড- ১৯ বা যাকে এনসিওভি বা নভেল করোনাভাইরাসও বলা হয় সেটি এই ৭টি প্রজাতির অন্তর্গত।

২০০২ এ চীনে সার্স নামক এক ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে প্রায় ৭৭৪ জন মারা গিয়েছে। সেই সার্স ভাইরাস (সিভিয়ার এ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিনড্রোম) ও ছিল একধরনের করোনাভাইরাস । তবে কোভিড- ১৯ এমন একটি ভাইরাস যা এর পুর্বে মানুষের মধ্যে কখনো ছড়ায়নি। 

এই ভাইরাসটি একজন থেকে আরেকজনে ছড়াচ্ছে এবং নিজের জিনগত গঠনেও পরিববর্তন আনছে। যাকে বলা হয় মিউটেশন। 

করোনাভাইরাসের উৎপত্তি কোথায় ?

মধ্য চীনের উহানের সামুদ্রিক মাছ বিক্রি হয় এমন একটি বাজার থেকে এই রোগটি সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে বলে মনে করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ধারণা এই ভাইরাসটির উৎস কোন এক প্রাণী।

এই প্রাণীটি থেকেই ভাইরাসটি প্রথমে মানুষের দেহে প্রবেশ করেছে এবং মানুষের মাধ্যমে একজনের দেহ থেকে আরেকজনে ছড়িয়েছে ।  অন্য কোন প্রাণী থেকে মানব দেহে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা এবারই প্রথম নয়।

যেমন মার্স ভাইরাস ছড়িয়েছে উট থেকে। আবার সার্স ভাইরাস প্রথমে বাদুড় থেকে। পরে তা গন্ধগোকুল থেকে মানব দেহে প্রবেশ করে। 

ভিডিওতে দেখতে পাচ্ছেন ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যাক্তিটি যেভাবে অন্যদের মাঝে ভাইরাসটি ছড়িয়ে দিচ্ছেন।

চীনের উহানের সামুদ্রিক বাজারে শুধু মাছই নয়, অবৈধভাবে বিভিন্ন জ্যান্ত প্রাণীও বিক্রি হত যেমন, মুরগি, বাদুড় , সাপ ইত্যাদি । তবে এখনও পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হতে পারেননি এই ভাইরাসটি কোন প্রাণী থেকে মানব দেহে ছড়িয়েছে।

তবে গবেষণা বলছে, চীনের হর্সশু নামের এক জাতের বাদুড়ের সঙ্গে কোভিড- ১৯ ভাইরাসের মিল রয়েছে। হতে পারে বাদুড় বা এই প্রাণীগুলোর কোনো একটি থেকে ভাইরাসটি মানবদেহে প্রবেশ করেছে।  

সারাবিশ্বে যেভাবে ছড়িয়ে পড়েছে ভাইরাসটি  

গত বছর ডিসেম্বরের ৩১ তারিখে, চায়না WHO কে জানায় যে তাদের ১ কোটি ১০ লক্ষ্য মানুষের বাসসস্থান উহানে যেটি হুবেই প্রদেশের অন্তর্গত সেখানে একটি অস্বাভাবিক নিউমোনিয়ার লক্ষন দেখা দিয়েছে এবং এর জন্য দায়ী ভাইরাসটির প্রজাতিও অজানা।

এরপর জানুয়ারির ১ তারিখে, এটি চীনের উহানের একটি সামুদ্রিক মাছ বাজারে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পরার পর সেটি বন্ধ করে দেয়া হয়।

জানুয়ারির ৫ তারিখে, চায়না আবারও জানায়, অজানা এই ভাইরাসটির সাথে ২০০২- ০৩ এ ছড়িয়ে পরা সার্স ভাইরাসের এর বৈশিষ্ট্যর কিছু মিল রয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানুয়ারির ৭ তারিখে, জানায়, তারা করোনাভাইরাস প্রজাতির একটি নতুন ভাইরাস খুঁজে পেয়েছে এবং এটির নাম দেয়া হয় কোভিড-১৯।

জানুয়ারির ১১ তারিখে, চায়না এই ভাইরাসে প্রথম মৃত্যুর কথা স্বীকার করে। আক্রান্ত ব্যাক্তি ৬১ বছর বয়সী একজন পুরুষ এবং তিনি সম্প্রতি বন্ধ হয়ে যাওয়া সামুদ্রিক মাছের বাজার থেকে পন্য কেনাকাটা করেছিলেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানুয়ারির ১৩ তারিখে, জানায় যে চায়নার বাহিরে প্রথম দেশ হিসেবে থাইল্যান্ডে এটি ছড়িয়ে পড়েছে। 

জানুয়ারির ১৬ তারিখ, জাপান এই রোগে আক্রান্ত একজন কে সনাক্ত করে যিনি কিছুদিন আগে চীনের উহান থেকে এসেছেন।

এরপর এটি একে একে ছড়াতে থাকে হংকং, তাইওয়ান, আমেরিকা, দক্ষিন কোরিয়া থেকে সারা বিশ্বে । 
WHO এর প্রতিবেদন থেকে জানা যায় বর্তমানে ১৯০ টি দেশে ছড়িয়ে পরা এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে ৩৩৪,৯৮১জন এবং মারা গিয়েছেন ১৪,৬৫২ জন (২৪/০৩/২০২০)। 

এটির সক্ষমতা কতটুকু?

ভাইরাসটির কারনে ফুসফুসে মারাত্মক সংক্রমন হয়ে থাকে। অস্ট্রেলিয়ার রয়েল অস্ট্রেলাসিয়ান কলেজ অফ ফিজিশিয়ান্সের প্রধান ও শ্বাস-প্রশ্বাসের চিকিৎসক জন উইলসন বলেছেন, এটি শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে মানুষের ফুসুফুসে পৌছায় এবং ফুসফুসের বায়ু পরিচালনের নালীতে সংক্রমিত হয়।

করোনাভাইরাসের উৎপত্তি

করোনাভাইরাসের সংক্রমণের ফলে মারা যাওয়া ৪৪ বছর বয়সী এক চীনা নাগরিকের ফুসফুসের চিত্র

এ জন্য বায়ু সঠিকভাবে ফুসফুসে পৌছাতে পারেনা। শ্বাসনালীর আস্তরণটি পেরিয়ে এটি গ্যাস এক্সচেঞ্জ ইউনিটে পৌঁছে যায় ও রোগীর অবস্থা খারাপ হতে থাকে। ফুসফুস বিভিন্ন প্রদাহজনক উপাদানে পূর্ণ হয়ে যাওয়ার ফলে রক্তে অক্সিজেন পেতে অক্ষম হয়ে পড়ে।

এছাড়া অক্সিজেন পাওয়ার জন্য শরীরের ক্ষমতা হ্রাস পায় ও শরীর থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড বের করতে পারে না। আর এতে মানুষ মৃত্যুর দিকে ধাবিত হয়।

রোগের লক্ষন গুলো কি?

বিজ্ঞানীরা বলছেন সংক্রমিত হবার পর এর লক্ষন দেখা দিতে অন্তত ৫ দিন সময় লাগে। এর প্রধান লক্ষন গুলো হচ্ছে জ্বর, শুকনো কাশি এবং শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া। প্রথমে জ্বর তারপর দেখা দেয় শুকনো কাশি। এর এক সপ্তাহের ভিতর দেখা দেয় শ্বাসকষ্ট।

এটির শুরুর দিকের উপসর্গ সাধারন সর্দিজ্বর এবং ফ্লুয়ের সাথে মিল থাকায় রোগ নির্নয়ের সময় চিকিৎসকরা দ্বিধাগ্রস্থ হয়ে পরেন। 

এর কোণ প্রতিষেধক রয়েছে কি?

এখনো বৈজ্ঞানিক ভাবে স্বীকৃত কোন প্রতিষেধক বা টিকা আবিষ্কৃত হয়নি। তবে বিজ্ঞানীরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রে ইতিমধ্যেই এজনের দেহে পরীক্ষামূলক করোনাভাইরাসের টিকা প্রয়োগ করা হয়েছে। ২০টির ও বেশি ভিন্ন ভিন্ন ভ্যাকসিন তৈরির উদ্যোগও ইতিমধ্যে নেয়া হয়েছে ।

জাপানের ফুজিফিল্ম কোম্পানির ঔষধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের তৈরি একধরনের প্রতিষেধকও কিছুটা কাজে দিচ্ছে এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে। তবে বৈজ্ঞানিক ভাবে প্রমাণিত এবং কার্যকারি ভ্যাকসিন পেতে অপেক্ষা করা লাগতে পারে আরো অনেক মাস। 

যেভাবে এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব

যেহুতু এখনো এর প্রতিষেধক আবিস্কার হয়নি তাই এই রোগ থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হচ্ছে অন্যদের মাধ্যমে ভাইরাসে আক্রান্ত না হওয়া।

অর্থাৎ,

  • মানুষের চলাচল সীমিত করে দেয়া 
  • বার বার হাত ধোয়া
  • হাচি কাশি দেবার সময় রুমাল বা টিস্যু ব্যবহার করা
  • অযথা নাক বা মুখে সংস্পর্শ করা থেকে বিরত থাকা  
  • বিনা প্রয়োজনে ঘরের বাহিরে বের না হওয়া
  • আক্রান্ত ব্যাক্তির কাছ থেকে অন্তত এক মিটার দূরত্ব বজায় রাখা
  • ভাল করে সেদ্ধ করে খাবার গ্রহন করা। এবং অসুস্থ প্রাণী না খাওয়া
  • খুব জরুরী প্রয়োজন ছাড়া বিদেশ ভ্রমন থেকে বিরত থাকা
  • অভ্যর্থনায় হাত না মেলানো বা কোলাকুলি না করা
  • চিকিৎসক এবং অন্যান্য সেবাদানকারি ব্যাক্তিদের প্রতিরক্ষামূলক পোষাক পরে অন্যদের সেবা দেয়া
এই ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে কোয়ারেন্টাইন না করলে যে অবস্থার সৃষ্টি হবে।

কোন বয়সীদের জন্য এটি বেশি হুমকি স্বরূপ?

যে কোন বয়সীরাই এই রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। তবে শিশু এবং বৃদ্ধদের রোগ প্রতিরোধ সক্ষমতা কম বিধায় তাদের ঝুঁকি থাকে বেশি এবং যাদের বয়স ৪০-এর বেশি তারাও অতি ঝুঁকির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত।

ইতালিতে আক্রান্তদের ৯০ শতাংশই আগ থেকে বিভিন্ন রোগে ভুগছিলেন। তাদের ৭৫ শতাংশ ছিলেন উচ্চ রক্তচাপের রোগী। তাই বলা যেতে পারে যেকোনো বয়সের অসুস্থ ব্যাক্তিরাই বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন । এবং অন্যান্য রোগে আক্রান্ত ব্যাক্তিরাই এই ভাইরাসের কারনে মারাও যাচ্ছেন বেশি।

এতোদিন ধারনা করা হত তরুণদের এই রোগে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা কম। আসলে এই ধারনা ঠিক নয়। কারন চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া অনেক তরুনের অবস্থা আশংকাজনক। 

সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পরা এই ভাইরাসে প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত এবং মৃত্যুর সংখ্যা। তবে এর মাঝেও আক্রান্তের ৩ ভাগের ১ অংশ ইতিমধ্যে সুস্থও হয়ে উঠেছেন। যেহুতু ইতিমধ্যেই বিজ্ঞানীরা এর ভ্যাকসিন তৈরি করা নিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তাই হয়তো সেদিন খুব দেরি নয় যেদিন এর প্রতিষেধক তৈরি হয়ে যাবে। আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা কমে আসবে এবং পুরো পৃথিবীর মানুষ আবার তার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে।

Subscribe to our Newsletter

সম্পর্কিত আরো লেখা সমূহ

//graizoah.com/afu.php?zoneid=3546031