করোনাভাইরাস নিয়ে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব

শেয়ার করুণ

Share on facebook
Share on twitter
Share on pinterest

পাঠকদের শুরুতেই বলে নেয়া ভাল যে করোনাভাইরাস নিয়ে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব গুলো বলা হবে সেগুলো কাওকে বিশ্বাস করতে বলা হচ্ছেনা বা লেখকের মনগড়া কোণ লেখা নয়। বরং বর্তমানে কোডিভ-১৯ নিয়ে যে কন্সপিরেসি থিওরি গুলো চর্চা হচ্ছে সেগুলো পাঠকের সামনে উপস্থাপন করা। 

কন্সপিরেসি থিওরি বা ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ কি?

ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বলতে মূলত কোন ঘটনার এমন ব্যাখ্যাকে বোঝায়, যা সুস্পষ্ট প্রমাণ ছাড়া কোন গভীর ষড়যন্ত্রের দিকে ইঙ্গিত করে থাকে, যার পেছনে সরকার (রাষ্ট্র) বা ক্ষমতাশীল কোন সংগঠনকে দায়ী করা হয়।

করোণার উৎস নিয়ে দেশে দেশে যত ষড়যন্ত্র তত্ত্ব

আমরা এখন পর্যন্ত বিজ্ঞান এবং গবেষকদের গবেষনা থেকে যা জানতে পেরেছি চীনের উহানের সামুদ্রিক মাছের বাজারের কোন বন্য প্রাণী থেকে প্রথমে এটি মানবদেহে প্রবেশ করে এবং পরে এই ভাইরাসটি সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পরে। কিন্তু কোভিড(১৯) নিয়ে চর্চিত কন্সপিরেসি থিওরি বলছে অন্য কথা। 

জাপানী মিডিয়া

জাপানী একটি টেলিভিশন চ্যানেলের একটি প্রতিবেদন নিয়ে মেতে উঠেছে চীনের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সিনা ওয়েইবো।  জাপানি টেলিভিশনের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে ইনফ্লুয়েঞ্জায় ১৪ হাজারের মতো মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এরমধ্যে অনেকেই করোনা ভাইরাসেও আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারে।

প্রতিবেদনটি প্রকাশ হওয়ার পরেই চীনের সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমটিতে ভাইরাল হয়ে যায় সংবাদটি। সেখানে ব্যবহারকারীরা বলছেন, ভাইরাসটির উৎপত্তিস্থল মূলত যুক্তরাষ্ট্র।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র

মার্কিন মিডিয়াতে ছড়িয়ে পড়া গুঞ্জন বলছে এই ভাইরাসের উৎস চীনের জীবানু অস্ত্র উৎপাদনের একটি গবেষণাগার। যুক্তরাষ্ট্রর ভাষ্যমতে চীনের উহানে অবস্থিত দেশটির একমাত্র লেভেল ফোর গবেষণাগারে এই ভাইরাস নিয়ে গবেষণা চলছিল।

অপর পক্ষে আরেকটি গুঞ্জন অনুযায়ী, প্রাণীদেহ থেকে সংগ্রহ করা এই ভাইরাস নিয়ে পরীক্ষা চলাকালে গবেষণাগার থেকেই এই ভাইরাস প্রকৃতিতে কারগরি ত্রুটির কারণে ছড়িয়ে পড়ে অথবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ছড়িয়ে দেয়া হয়।

এছাড়া ক্যালিফোর্নিয়া থেকে কংগ্রেসে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন এমন এক রিপাবলিকান রাজনীতিক জোয়ান রাইট টুইট করেছেন, ‘উহান ল্যাবরেটরিতে এই করোনাভাইরাস তৈরি করা হয়েছে, এবং ওই গবেষণায় চীনাদের সহায়তা করেছেন বিল গেটস’।

রাশিয়ান মিডিয়া

সম্প্রতি রাশিয়ান মিডিয়া যে তত্ত্বটি প্রচার করেছে তা হল করোনাভাইরাসের ‘করোনা’ শব্দটি নিয়ে। ল্যাটিন এবং রাশিয়ান-দুই ভাষাতেই করোনা শব্দের অর্থ মুকুট, তারা তাদের প্রতিবেদনে বলছে, এর থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প এর সাথে কোনভাবে জড়িত। আর এর কারণ হচ্ছে, তিনি সুন্দরী প্রতিযোগিতায় সভাপতিত্ব করেছেন এবং বিজয়ীদের হাতে মুকুট তুলে দিয়েছেন।

ইসরাইল

ইসরাইলের সামরিক গোয়েন্দা বাহিনীর সাবেক এক কর্মকর্তা বলেছেন, প্রাণঘাতী চীনা করোনাভাইরাস বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে উহানের গোপন এক জীবাণু গবেষণাগারের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।

চীনা মিডিয়া

চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্রও ঝাও লিজিয়িান টুইটারে মার্চের ১১ তারিখে মার্কিন একটি কংগ্রেস কমিটির সামনে সেদেশের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোলের (সিডিসি) প্রধান রবার্ট রেডফিল্ডের একটি শুনানির ভিডিও ক্লিপ পোষ্ট করেছেন। ঐ ফুটেজে মি রেডফিল্ড যুক্তরাষ্ট্রে কিছু ইনফ্লুয়েঞ্জা-জনিত মৃত্যুর ঘটনা সম্পর্কে বলছেন, পরীক্ষায় দেখা গেছে কোভিড-নাইন্টিনের কারণেই ঐ মৃত্যু। অর্থাৎ চীন সন্দেহ করে কোডিভ(১৯) এর উৎস যুক্তরাষ্ট্র।

ইরানী মিডিয়া

ইরানের ভেতরেও ব্যাপক মানুষের বিশ্বাস এই জীবাণু যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি। এমনকি ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডের কম্যান্ডার মেজর জেনারেল হুসেইন সালামি সরাসারি বলেছেন, করোনাভাইরাস যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি একটি জীবাণু অস্ত্র।

গত পাঁচই মার্চ জে. সালামি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে চীনে এবং পরে ইরানের বিরুদ্ধে “জীবাণু-অস্ত্রের সন্ত্রাসী হামলা” চালিয়েছে।

করোনাভাইরাস মানব সৃষ্ট ?

নেচার মেডিসিন সাময়িকীতে বলা হয়েছে, গবেষকরা করোনাভারাসটির জেনোম সিক্যুয়েন্স বিশ্লেষণ করেছেন আর এটি যে মানুষ তৈরি করেনি, প্রাকৃতিকভাবে উদ্ভব হয়েছে সে বিষয়ে জোরালো প্রমাণ পেয়েছেন।

গবেষণা প্রতিবেদনটির সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, “আমাদের বিশ্লেষণ পরিষ্কারভাবে দেখিয়েছে, সার্স-কভ-টু গবেষণাগারে তৈরি করা হয়নি বা উদ্দেশ্যমূলকভাবে পরিবর্তন করা ভাইরাস নয়।”

তারা দেখেছেন, ওই প্রোটিনের নির্দিষ্ট কিছু বৈশিষ্ট্য মানুষের কোষের সঙ্গে মেলবন্ধন ঘটাতে এতোটাই সক্ষম যে এটি প্রাকৃতিক নির্বাচনের ফল ছাড়া অন্য কিছু হতে পারে না, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে এটি তৈরি হয়নি।

তবে কন্সপিরেসি থিওরি বা ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’  বলছে অন্য কথা। এই থিওরি বলছে এই ভাইরাস মানব সৃষ্ট এবং এটি চীনের জীবাণু অস্ত্রের ল্যাবরেটরি থেকে উদ্দেশ্যমূলক-ভাবে অথবা দুর্ঘটনাবশত ছড়িয়ে পরেছে। 

মার্কিন প্রেসিডেনশিয়াল মেডেল অফ ফ্রিডম পুরষ্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তিত্ব রাশ লিয়ামবাগ গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ব্যক্তিগত মত প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন,

“এটি সম্ভবত একটি চায়না ভিত্তিক গবেষণা যা ধীরে ধীরে জীবাণুঅস্ত্র হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছিল।“ তিনি আরো যোগ করেন, “সমস্ত সুপারপাওয়ার জাতিই জীবাণু অস্ত্রে সজ্জিত।“ 

রিপাবলিকান সিনেটর টম কটন এরইমাঝে বেশ কবার কংগ্রেস এবং ফক্স নিউজে প্রচার করেছেন যে এই ভাইরাসটি সম্ভবত কোন ল্যাব থেকেই এসেছে।

ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের এক সাবেক কর্মকর্তাও এই ভাইরাস চীন তৈরি করেছে বলে দাবি করেছেন।

এ ভাইরাস ছড়িয়ে পরার দ্বায় কার ? 

যদি এর উত্তর সোজাসাপ্টা ভাবে দেয়াহয় তাহলে বলতে হবে অবৈধ ভাবে প্রাণী শিকার ও তা খাওয়ার কারনেই এই ভাইরাস ছড়িয়ে পরেছে। এবং এরজন্য দায়ী চীনের জনগনের খাদ্যাভ্যাস।

কিন্তু চর্চিত কন্সপিরেসি থিওরি বা ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ বলছে অন্য কথা ? 

বলা হচ্ছে এটি চীনের গবেষণাগারে তৈরি একটি জীবানু অস্ত্র। চীনের উহানের জৈব অস্ত্র তৈরির এক গবেষণাগার থেকে এটি  ইচ্ছাকৃত বা দুর্ঘটনাবশত ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এবং এর উদ্দেশ্য হংকঙ্গে চীন বিরোধ দমন করা এবং বিশ্বে চীণের একটি প্রভাব বলয় তৈরি করা।

এতে চীন আগের থেকে তৈরি করা এন্টিবায়োটিক দিয়ে নিজেদের মুক্ত করবে এবং বাকি বিশ্বে নিজেদের সুপার পাওয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে।

অপরদিকে জাপানের একটি টিভি চ্যানেল ও চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র ইতিমধ্যে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পরার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেছেন। তাদের ভাষ্যমতে যুক্তরাষ্ট্রে ইনফ্লুয়েঞ্জায় ১৪ হাজারের মতো মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এরমধ্যে অনেকেই করোনা ভাইরাসেও আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারে। প্রতিবেদনে ইঙ্গিত করা হয় যে, হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের সরকার বুঝতেই পারেনি কীভাবে ভাইরাসটি ছড়িয়ে গিয়ে প্রাণহানির ঘটনা ঘটিয়েছে।

একজন চীনা কূটনীতিক তার টুইটার অ্যাকাউন্টে এক পোস্টে সরাসরি ইঙ্গিত করেছেন, উহানে গত বছর অক্টোবর মাসে একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে আসা মার্কিন সেনাবাহিনীর একটি দল এই ভাইরাস ছড়িয়ে গেছে।

ব্যাপকভাবে আরেকটি বিষয় বিশ্বাস করা হয়ে থাকে চীনের করোনাভাইরাস কৃত্রিমভাবে বানানো হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কিংবা আমেরিকার ওষুধ কোম্পানিগুলো এর জন্য দায়ী। 

রাশিয়ার টিভি প্রতিবেদনে ক্রেমলিনের মিডিয়া এবং কর্মকর্তাদের ছড়ানো কিছু তথ্য তুলে ধরা হয়। যাতে বলা হয়, জর্জিয়াতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি পরীক্ষাগার রয়েছে যেখানে মানুষের উপর জৈবিক অস্ত্রের পরীক্ষা করা হয়। 

রাশিয়ার সরকার সমর্থিত স্পুটনিক রেডিওতে একটি অনুষ্ঠান প্রচার করা হয়েছে যেখানে বলা হয়েছে, ব্রেক্সিটের পর বাজার খুলে দেওয়ার জন্য চীনকে বাধ্য করতে ব্রিটেন এই কাণ্ড ঘটিয়ে থাকতে পারে।

রুশ একটি জনপ্রিয় টিভি টকশোতে (দি বিগ গেম) ইগর নিকুলিন নামে রুশ একজন মাইক্রোবায়োলজিস্ট বলেন, ব্রিটেন এই করোনা ‘অস্ত্র’ তৈরি করেছ।

তিনি বলেন, “(ব্রিটেনের) পোর্টান ডাউনে একটি গবেষণাগারে বহুদিন ধরেই নানা জীবাণু এবং রাসায়নিক অস্ত্র তৈরির কাজ চলছে।”

তবে ব্রিটেন যে কোণ ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়ায়নি এটা কিন্তু ভাবার কোন কারন নেই। ব্রিটিশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ট্যাবলয়েড মিডিয়ায় প্রকাশিত আরেকটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব প্রকাশিত হয়েছিল সেখানে চীনের এক নারীর বাদুরের স্যুপ খাওয়ার ভিডিও’র সাথে করোনাভাইরাসকে সম্পৃক্ত করা হয়েছিল।

ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল যে, করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার শুরুর দিকে এটির প্রাদুর্ভাবের কেন্দ্রস্থল উহানে ভিডিওটি ধারণ করা হয়েছে।

যদিও আসলে ভিডিওটি চীনে নয় বরং ২০১৬ সালে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের পালাউ’তে ধারণ করা হয়েছিল।

এভাবেই করোণাভাইরাস নিয়ে বিশ্বে ছড়িয়ে পরেছে নানারকম ষড়যন্ত্র তত্ত্ব। দেখে মনে হবে যে তারা হয়তো ষড়যন্ত্র তত্ত্বের ভ্রান্ত ধারণা অপসারণ করছে, কিন্তু দর্শকদের মধ্যে তারা এমন একটি অনুভূতি দেয় যে, এতে হয়তো কিছুটা সত্যও থাকতে পারে। তাই সকলের সচেতনতা কাম্য।

Subscribe to our Newsletter

সম্পর্কিত আরো লেখা সমূহ