কিছু ঐতিহাসিক অভিশাপের কাহিনী

শেয়ার করুণ

Share on facebook
Share on twitter
Share on pinterest

কখনো কখনো মানুষের জীবনে এমন কিছু অদ্ভুত ঘটনা ঘটে যার কোন উপযুক্ত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়না। কেউ কেউ সেগুলোকে কাকতালীয় ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করেন আবার কেউবা আবার সেগুলোকে অভিশাপ ভেবে তটস্থ থাকেন। ইতিহাসের পাতা ঘাটলে এমন কিছু বিখ্যাত ঘটনা পাওয়া যাবে যেগুলো মানুষ কাকতালীয় বা অভিশপ্ত ঘটনা হিসেবেই যুগ যুগ ধরে জেনে এসেছে। ইতিহাসের এমনই কিছু বিখ্যাত অভিশাপের কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে আজকের লেখাতে। 

তৈমুর লং

তৈমুর লং ছিলেন ইতিহাসের অপরাজেয় সমর নায়ক। ১৩৩৬ সালের ৯ এপ্রিলে জন্মগ্রহন করা সমর নায়কের শাসনকাল ছিল ৩৫ বছর পর্যন্ত। তার পরিচালিত যুদ্ধ অভিযানে ১৭ মিলিয়নের মতো মানুষ মারা গিয়েছিলো বলে ধারনা করা হয়।

তার মৃত্যুর পর তাকে তৈমুর লং এর রাজধানী সমরকন্দে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে সমাধিস্থ করা হয়। এরপর কেটে যায় দীর্ঘ সময়। জোসেফ স্ট্যালিন ১৯৪১ সালে প্রখ্যাত রাশিয়ান নৃবিজ্ঞানী মিখাইল গেরাসিমোভ’কে তৈমুর লং এর দেহাবশেষের উপর বিভিন্ন গবেষণার জন্য সমরকান্দে পাঠিয়েছিলেন।

স্থানিয়রা তৈমুর লং এর একটি ভয়ঙ্কর অভিশাপ সম্পর্কে অভিহিত ছিলেন। ফলে তারা গেরাসিমোভ’কে তৈমুর লং এর সমাধির একটি ভয়াবহ অভিশাপ সম্পর্কে সতর্ক করেন। কিন্তু রাশিয়ান এই নৃবিজ্ঞানী সমাধির অভিশাপের কথা বিশ্বাস করেননি। তিনি কুসংস্কার হিসেবে বিবেচনা করে বিষয়টি উপেক্ষা করেন।

অতঃপর নৃতত্ত্ববিদরা সমাধিটি উন্মুক্ত করার পর একটি অদ্ভুত লিপিবদ্ধ অভিশাপ দেখতে পান। যার অর্থ ‘যারাই আমার সমাধিটি খুলবে, তারা আমার চেয়ে ভয়ঙ্কর আক্রমণকারীর শিকার হবে।’

কাকতালীয়ভাবে এর মাত্র দু’দিন পর হিটলার আক্রমণ করে বসেন সোভিয়েত ইউনিয়নে এবং এতে প্রায় ২৬ মিলিয়ন লোক প্রাণ হারায়। ১৯৪২ সালে স্টালিন তৈমুরের দেহাবশেষ ইসলামিক রীতি অনুযায়ী পুনরায় কবর দেয়ার নির্দেশ দেন। আবারো কাকতালীয়ভাবে এর কিছুদিন পরেই স্টালিনগ্রাদে জার্মান বাহিনী আত্মসমপর্ণ করে।

অভিশপ্ত নীল রত্ন

অভিশপ্ত রত্নের তালিকার শীর্ষ স্থানটিতে রয়েছে এই রত্নটি । ফরাসি বণিক জ্যঁ-ব্যাপটিস্ট ত্রাভেনিয়ে নীল রঙের হীরেটি  ভারত থেকে কিনেছিলেন।

পরবর্তীতে ত্রাভেনিয়ে ফরাসি রাজপরিবারে এই দুর্লভ হীরেটি বিক্রি করে দিয়েছিলেন । ফরাসি বিপ্লবের আগপর্যন্ত এটি ফ্রান্সের বিভিন্ন রাজপুরুষের মাথার মুকুটে শোভা পেয়েছে। ফরাসি বিপ্লবের পর ফ্রান্সজুড়ে লুটতরাজ হয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতায় ১৭৯২ সালের সেপ্টেম্বরে হীরেটি হারিয়ে যায়।

১৮১২ সালে লন্ডনের এক ব্যবসায়ী ড্যানিয়েল এলিয়াসন ফের প্রকাশ্যে নিয়ে আসেন এই হীরে। তবে ততদিনে নতুন করে কেটে এর জেল্লা আরও বাড়ানো হয়েছে। কয়েক হাত ঘুরে শেষে এটি কিনে নিয়েছিলেন লন্ডনের রত্ন সংগ্রাহক ও ব্যাংকার হেনরি ফিলিপ হোপ। সেই থেকেই এই দুর্লভ হীরের নাম হয়ে যায় ‘হোপ ডায়মন্ড’।

এভালিন ওয়ালশ ম্যাকলিন হোপ ডায়মন্ড কিনে নিজের জীবনে ঝড় বয়ে এনেছিলেন। তার নিজের মৃত্যু হয়েছিল করুণভাবে।

হোপ পরিবারের দখলে দীর্ঘদিন থাকার পর বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে এটি কিনে নিয়েছিলেন পিয়েরে কারতিয়ে। এরপর মার্কিন ধনকুবের এভালিন ওয়ালশ ম্যাকলিনের স্বামী এডওয়ার্ড বিলে ম্যাকলিন হীরকখণ্ডটি কিনে তাকে উপহার দিয়েছিলেন।

ম্যাকলিন এটি কিনেছিলেন ১৯১১ সালের জানুয়ারি মাসের ২৮ তারিখে। এর দাম ছিল ১ লাখ ৮৯ হাজার ডলার; ২০১৯ সালের হিসাবে তা দাঁড়িয়েছিল ৪৯ লাখ ৩৯ হাজা ডলারে। কথিত আছে, এভালিনের কাছে হিরেটি বিক্রির জন্যই প্রথম অভিশাপের প্রসঙ্গ টেনে এনেছিলেন পিয়েরে কারতিয়ে। এতে এভালিন বেশ আকৃষ্ট হয়েছিলেন।

কেনার পর থেকে এভালিনের পরিবারে বেশ কিছু দুর্ঘটনা ঘটে। যেমন: এভালিনের এক ছেলে মারা যান গাড়ি দুর্ঘটনায়, তার স্বামী পালিয়ে যান অন্য এক নারীর সঙ্গে এবং পরে তার করুণ মৃত্যু হয়। এমনকি এভালিনদের পারিবারিক মালিকানাধীন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট দেউলিয়া হয়ে যায়। 

এর মধ্যেই এভালিনের মেয়ে অতিরিক্ত ঘুমের ওষুধ খেয়ে মারা যান। এর ঠিক পরের বছরই মারা যান এভালিন নিজে। পরে ঋণ শোধ করতে গিয়ে বিক্রি হয়ে যায় তার সব রত্ন ও অলংকার।

বর্তমানে স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউশনের জাদুঘরে সাজিয়ে রাখা আছে হোপ ডায়মন্ড। ১৯৫৮ সালে এই হীরেটি স্মিথসোনিয়ানে দান করা হয়। প্রতিবছর লাখ লাখ দর্শনার্থী হোপ ডায়মন্ড দেখতে আসেন। জাদুঘরে স্থান পাওয়ার পর থেকে অবশ্য হোপ ডায়মন্ডের ‘অভিশাপ’ নিয়ে আর কোনো উচ্চবাচ্য হয়নি।

অভিশপ্ত মমি রহস্য

১৯৯১ সালে অস্ট্রিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের ওট্‌জাল পর্বতমালায় খুঁজে পাওয়া যায় ৩,৩০০ বছরের পুরনো একটি মমি। জায়গার নাম অনুযায়ী মমিটির নাম রাখা হলো ওটজি। কিন্তু সন্ধান পাবার বছরখানেক পর থেকেই ওটজিকে ঘিরে ঘটতে থাকলো অদ্ভুত কিছু ঘটনা।

ওটজির দেহ আবিষ্কার, বরফের নিচ থেকে উঠিয়ে আনা ও তার মমি নিয়ে যারা গবেষণা করেছেন, তাদের অনেকের অস্বাভাবিকভাবে একই বছরে মৃত্যু হয়

হেলমুট সিমন(৬৭), যিনি প্রথম ওটজির দেহ দেখতে পান,হাইকিং এ বেড়িয়ে প্রবল তুষারপাতের কবলে পড়ে মারা যান ঠিক সেই জায়গাটিতে, যেখানে ওটজিকে তিনি পেয়েছিলেন। সিমনের শেষকৃত্যানুষ্ঠানের মাত্র এক ঘণ্টার মাথায় যিনি সিমনের দেহ উদ্ধারের কাজে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সেই ডিয়েটার ওয়ারনেকে(৪৫) এক আকস্মিক হার্ট এটাকে মারা যান। এরপর এপ্রিলে প্রত্নতত্ত্ববিদ কনরাড স্প্লিন্ডার(৫৫) মাল্টিপল স্ক্লেরোসিসে ভুগে মারা যান। তিনিই প্রথম ওটজির দেহ পরীক্ষা করেছিলেন। 

ওটজিকে পরীক্ষাকারী ফরেনসিক টিমের প্রধান রেইনার হেন (৬৪) যখন ওটজিকে নিয়ে একটি বক্তব্য প্রদানের জন্য যাচ্ছিলেন, তখন এক ভয়াবহ গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যান। পর্বতারোহী কার্ট ফ্রিটজ ( ৫২) যিনি হেনকে ওটজির মমির সন্ধান দিয়েছিলেন, পর্বতারোহণের সময় তুষারধ্বসের নিচে চাপা পড়ে মারা যান। 

ওটজিকে তার বরফাচ্ছাদিত সমাধি তেকে ওঠানোর ছবিধারণকারী অস্ট্রিয়ান সাংবাদিক রেইনার হোয়েযল (৪৭) মারা যান মস্তিষ্কের টিউমারে আক্রান্ত হয়ে।

আমেরিকান বংশদ্ভূত মলিকুলার প্রত্নতত্ত্ববিদ টম লয়কে তার ব্রিজবেনের বাসায় হঠাতই মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। ঘটনাটি ঘটে ওটজিকে নিয়ে তার লেখা বইটি চূড়ান্ত রূপ পাবার মাত্র ২ সপ্তাহ আগে। 

বরফ মানব ওটজির মমি নিয়ে গবেষণা শুরু করেন আরেক প্রত্নতত্ত্ববিদ, কুইন’সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্কিওলজিক্যাল সায়েন্স বিভাগের পরিচালক। আর এই গবেষণা শুরুর পর পরই তিনি রক্তের নানা সমস্যায় আক্রান্ত হন, যেটি টানা ১২ বছর ধরে তাকে ভোগাতে থাকে।

অভিশপ্ত চেয়ার

শুনে কিছুটা অবকা হওয়াই স্বাভাবিক। চেয়ারও আবার অভিশপ্ত হয় নাকি? কিন্তু একটি চেয়ার কিভাবে অভিশপ্ত হল তা নিয়েও আছে একটি ঘটনা। চেয়ারে বসে থাকা অবস্থায় নিজ শ্বশুরকে হত্যার দ্বায়ে ১৭০২ সালে তাকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। 

ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তার শেষ ইচ্ছা জানতে চাওয়া হয়। সে তার অতিপ্রিয় পানশালাতে গিয়ে নিজের প্রিয় চেয়ারে বসে জীবনের শেষ খাবার খাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে। খাবার শেষ করে সে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় এবং বলে উঠে, “যে এই চেয়ার বসবে সে হঠাৎ করেই মারা যাবে।“

বাস্‌বির এমন অভিশাপের কথা শুনে তখনকার সময়ের মানুষ আতংকে আর ভয়ে সেই চেয়ারে বসতে সাহস পেত না।

এরপরের দুইশ বছর পার হয়ে গেলেও চেয়ারটি সেই পানশালাতেই রয়ে যায়। কেউ তাতে বসতো না। ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় একজন বৈমানিক সেই পানশালাতে এসে সেই অভিশপ্ত চেয়ারে বসলেন। এরপর তিনি আর যুদ্ধ থেকে ফিরে আসেননি। 

এছাড়া যে সৈন্যই এই চেয়ারে বসেছে তাদের সবার পরিণতিই একই হয়েছিল। ১৯৬৭ সালে ব্রিটিশ রাজকীয় বিমান বাহিনীর দুইজন পাইলট ঐ চেয়ারে বসেছিলেন। খাওয়া-দাওয়া শেষে পানশালা থেকে বের হয়েই তারা এক ট্রাক দুর্ঘটনায় মারা যান। 

১৯৭০ সালে একজন স্থপতি এই চেয়ারে বসে এই অভিশাপ ভুল প্রমাণ করতে চেষ্টা করেন। সেদিন বিকেলে তিনি এক গর্তে পড়ে মারা যান। এরপর আরেক ছাদ ঢালাইকারী ঐ চেয়ারে বসেন, আর ছাদ থেকে পড়ে যান। আরেক মহিলা মারা যান মস্তিষ্কের টিউমারে।

রাসপুতিনের ভবিষ্যৎ বাণী

সাইবেরিয়ার এক গরীব কৃষক পরিবারে জন্ম নেয়া রাসপুতিন পরিচিত ছিলেন তার অদ্ভুত রোগ সারানোর ক্ষমতার কারনে। একসময় তিনি এই পরিচিতির সুবাদে রাশিয়ার সম্রাট দ্বিতীয় নিকোলাসের সভায় জায়গা করে নিতেও সক্ষম হন।

রাসপুতিনের করা ভবিষ্যৎ বাণীগুলোর কার্যকারিতা দেখে সম্রাজ্ঞী আলেকজান্দ্রা ফিওদোরোভ্‌না তাকে তার ব্যক্তিগত পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেন।

কিন্তু সম্রাজ্ঞির সাথে রাস্পুতিনের ঘনিষ্ঠতাতে কে অনেকেই সহজ ভাবে মেনে নিতে পারেনি তাই তারা রাস্পুতিনকে নানাবিধ উপায়ে হত্যার চেষ্টা করতে থাকলেন। 

মৃত্যুর আগে রাসপুতিন সম্রাটের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন। সেখানে তিনি ভবিষৎবাণী করেছিলেন যে, তাকে খুন করা হলে রাশিয়ার রাজ পরিবারের কী হবে! সেখানে তিনি বলেছিলেন তার মৃত্যুর বছরখানেকের মাঝেই সপরিবারে নিহত হবেন সম্রাট এবং সত্যি সত্যিই সেটি ঘটেছিলো। মাত্র দেড় বছরের মাঝেই সম্রাট, সম্রাজ্ঞী এবং তাদের পাঁচ সন্তান নৃশংসভাবে খুন হয়েছিলেন।

Subscribe to our Newsletter

সম্পর্কিত আরো লেখা সমূহ