ড্রাকুলা সুন্দরিঃ চির যৌবনের আশায় কুমারীদের রক্তে স্নান করা এক নারী

শেয়ার করুণ

Share on facebook
Share on twitter
Share on pinterest

আপনার প্রত্যেকেই জীবনে একবার হলেও ভ্যাম্পায়ার বা ড্রাকুলার সম্পর্কে শুনেছেন। এ নিয়ে অনেকের মনেই আছে নানারকম জল্পনা কল্পনা। তবে আমরা আজকের আয়োজনে এদের অস্তিত্বের সার্টিফিকেট দিবোনা। আজ আমরা আপনাকে এমন একজন নারীর সম্পর্কে জানাবো যিনি তার যৌবন ধরে রাখার জন্য প্রান নিয়েছিলেন নিরীহ ৬৫০ জন্য কুমারী নারীর প্রান। Elizabeth Bathory যাকে ইতিহাসের পাতায় লিখে রাখা হয়েছে ড্রাকুলা সুন্দরী নামে। বা তাকে বলা যেতে পারে ইতিহাসের এক কুখ্যাত নারী সিরিয়াল কিলার। 

ড্রাকুলা কাউন্টস বা ব্লাডি কাউন্টস নামে পরিচিত Elizabeth Bathory ১৫৬০ সালের ৭ই আগষ্ট তখনকার সময়ের হাঙ্গেরির সবচেয়ে ধনী পরিবিবারে জন্মগ্রহন করেছিলেন। এস্কেট প্রাসাদেই কেটেছিল তার শৈশব কাল। ছোট থেকেই তার কোন অভাব ছিলনা। তিনি ছিলেন শিক্ষিতা, সুন্দরী এবং ধনী একটি পরিবারের মেয়ে। তখনকার সময়ে শিক্ষিত নারী হবার সুবাদে তিনি সমাজে অনেক বাহবা পেতেন। ল্যাটিন, জার্মানি এবং গ্রীক ভাষায় তিনি পটু ছিলেন।

কিন্তু তার জীবনে প্রথম সমস্যা আসে যখন তার বয়স ১৩ বছর। তখন বিবাহের পূর্বেই তিনি গর্ভবতী হয়ে যান। তাদের জমিতে কর্মরত এক কৃষকের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য যাইহোক না কেন তখন একজন মহিলা টাকার বিনিময়ে সেই বাচ্চার দায়িত্ব নিতে রাজি হন এবং বাচ্চাটিকে সেই শহর থেকে দূরে পাঠিয়ে দেয়া হয়। 

তারপর সেই কৃষকের সাথে Elizabeth Bathory পরিবার কি করেছিল তার কোন খবর জানা যায়নি। এ ঘটনার ঠিক দু বছর পরে এলিজাবেথের দশ বছর বয়স থেকে ঠিক করে রাখা ছেলে Ferenc Nádasdy এর সাথে বিয়ে দেয়া হয়। এই বিয়েতে উপস্থিত ছিলেন ৪৫০০ অতিথি। যেহুতু তাদের পারিবারিক ভিত্তি সমাজে খুব উচু স্তরে ছিল তাই তিনি বিয়ের পর পদবী বদলাতে রাজী হননি।

বিয়ের পর তার স্বামী তাকে ক্যাসেটিচ প্রাসাদের মালিকানা দিয়ে দেন। এই প্রাসাদকে কেন্দ্র করে ছিল বিশাল জমি, ফুলের বাগান এবং সতেরটি গ্রাম। এবং বিয়ের পর তারা সেখানেই থাকতে শুরু করলেন। ১৫৭৮ সালে তার স্বামী তাকে  হাংগেরিয়ান সেনাবাহিনীর কমান্ডারের পদ দেন। এর পরপরই অটোনমজদের বিরুদ্ধে চলা যুদ্ধের সকল দায়দায়িত্ব এসে পরে তার কাঁধে। 

এরজন্য তাকে ঘর সংসার ছেড়ে যুদ্ধের ময়দানে চলে যেতে হয়। এসময় তিনি তার সম্রাজ্য এবং ব্যবসার দেখাশুনা করতেন। তিনটি ভাষায় দক্ষতা থাকায় সম্রাজ্য চালাতে তার কোনরকম অসুবিধায় পরতে হতোনা। ঠিক যেন ওয়ান ম্যান আর্মি। 

১৬০২ থেকে ১৬০৪ এই সময়কালীন মুহুর্তে এলিজাবেথের বিষয়ে কিছু কটু কথা মানুষের মুখে মুখে ঘুরতে থাকে। গ্রামবাসীরা তাকে রাক্ষুসি বলতো। শতশত মেয়েরা তার প্রাসাদে যেত কাজের জন্য এবং তারা আর কক্ষনো ফেরত আসতোনা। এলিজাবেথ বলতো তারা কলেরা রোগে মারা গেছে। এবং তাদেরকে সে নিজেই কবর দিয়েছে।

লুথেরানের একজন মন্ত্রী ইস্তাবাহান ম্যাগাডি প্রথমবার অভিযোগ দায়ের করেন আদালতে। কিন্তু আদালত এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে দেরী করে ফেলে। কারন সেসময় এলিজাবেথের পরিবার ছিল খুবই প্রভাবশালী এবং তখন এলিজাবেথের অবস্থান ও ছিল খুব উচু পদে। 

১৬১০ সালে রাজা দ্বিতীয় ম্যাথিয়াস হাঙ্গেরির একজন ডিটেক্টিভ প্যালাকোন গিওরকি থুরোজেস কে এই বিষয়ে তদন্তের জন্য নিয়োগ করেন। থুরোজস ধীরে ধীরে এলিজাবেথের বিরুদ্ধে তথ্য প্রমান সংগ্রহ করতে থাকে। একবছর ধরে তদন্ত চালানর পরে ৩০০ জন সাক্ষীকে কি তিনি জরো করেছিলেন এলিজাবেথের বিরুদ্ধে। এদের ভিতর প্রাসাদের রাঁধুনি, তাদের সাথে অন্যান্য কাজ করা লোক, চার্চের ফাদার, খুন হওয়া পরিবারের লোকজন ও ছিল।

আদালতের অনুমতি পাবার পর পুলিশ এলিজাবেথের প্রাসাদে তল্লাশি চালায় এবং এলিজাবেথকে হাতে নাতে ধরে ফেলা হয়। প্রাসাদে সার্চ করার পর পুলিশ যা খুঁজে পায় তাতে তাদের হৃদ স্পন্দন প্রায় বন্ধ হয়ে যাবার দশা হয়। সারা প্রাসাদ জুড়ে বিভিন্য গোপন স্থানে মেয়েদের মৃতদেহ রাখা ছিল। বহু আহত মেয়েকে শেকল পরা অবস্থায় অন্ধকার স্যাতস্যাতে ঘর থেকে উদ্ধার করা হয়। কোন কোন স্থানে মেয়েদের কেটে ফেলা শরীরের অংশ ও চোখে পরে। 

তথ্যপ্রমাণ থেকে জানায় যায়, এলিজাবেথ প্রথমে তার জমিনে কাজ করা অল্পবয়সী মেয়েদের শিকার করা শুরু করেছিল। ধীরে ধীরে তার অপরাধ বিস্তৃত হতে থাকে। তিনি তিনজন বিশ্বস্ত চাকর নিয়ে একটি দল গঠন করেন। তারা বিভিন্ন স্থান থেকে গরীব ঘরের অবিবাহিত মেয়েদের প্রাসাদে নিয়ে আসতো বেশি টাকা উপার্জনের লোভ দেখিয়ে। 

প্রাসাদে আসার পরই শুরু হতো পৈশাচিক নারকীয় অত্যাচার। এসব মেয়েদের বস্ত্রহীন করে আঙ্গুল কেটে নেয়া হতো, শরীরে সূচ ফোটানো হতো, কান কেটে নেয়া হতো এবং একটা সময় শরীরের সব রক্ত বের করে নেয়া হতো। এবং সেই রক্ত জমিয়ে রাখা হতো একটা পাত্রে যা দিয়ে এলিজাবেথ স্নান করতেন!!

এতোকিছু পরেও এলিজাবেথের মনের তৃষ্ণা মিটতোনা। মেয়ে গুলোকে কখনো কখনো ঠান্ডা জলে ফেলে দেয়া হতো আবার কখনো শরীরে মধু মাখিয়ে মৌমাছিকে খেতে দেয়া হতো। আহত মেয়েদের জবানবন্দি থেকে জানা যায় যে, এলিজাবেথ একই সাথে রক্ত খেকো এবং মাংশ খেকো ছিলো। সে তার দাঁত দিয়ে মেয়েদের শরীর থেকে মাংশ খুবলে খেতো। এসব কাজে তাকে সহযোগিতা করতো এলিজাবেথের তিনজন কর্মচারী। যাদের পরবর্তীকালে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল। তারা তাদের সকল দোষ স্বীকার করে নিয়েছিল।

তাদের ভাষ্যমতে এলিজাবেথ কুমারী মেয়েদের রক্ত দিয়ে গোসল করতো। কারন এলিজাবেথের বিশ্বাস ছিল এতে তার রুপ ও যৌবন চিরস্থায়ী এবং অক্ষত থাকবে। তিনি অতিরিক্ত কালো জাদুতে বিশ্বাসী ছিলেন। তার বিশ্বাস ছিল একটি মেয়েকে যত কষ্ট দিয়ে মারা হবে তার রক্ত তত বেশি  শুদ্ধ হবে। 

এ পর্যন্ত কতোজন নারীকে তিনি হত্যা করেছিলেন তার সঠিক তথ্য পাওয়া যায় সুজান নামের এক কর্মচারীর কাছ থেকে। সে জানায় যে, এলিজাবেথ তার ডায়রিতে হত্যা করা সকল নারীর বিস্তারিত লিখে রেখেছিল। এবং সেখানে ছিল ৬৫০ জন নারীর নাম। 

কিন্তু গ্রামবাসীদের মতে এই কাজ এলিজাবেথ চালিয়ে যায় বহুবছর এবং তাতে ১ হাজারের ও বেশি মেয়ে প্রান হারায়। যদি তাই হয় তবে তার ডায়রিতে কেন ৬৫০ জন নারীর বিবরণ লেখা ছিল তা আজও জানা যায়নি। 

এলিজাবেথের ৩ জন সহকর্মীর মৃত্যুদণ্ড হলেও এলিজাবেথের কিন্তু মৃত্যুদণ্ড হয়নি। কারন সে একজন ধনী পরিবারের মেয়ে ছিল। কিন্তু তাকে শাস্তি দেয়া হয়। তাকে তার প্রাসাদে দরজা এবং জানালাহিন ছোট একটা রুমে আমৃত্যু বন্দি থাকবার শাস্তি দেয়া হয়। এভাবে চার বছর কাটানোর পর ২১ নভেম্বর ১৬১৪ সালের এক রাতে সে তার রুমের পাহারাদারকে বললো তার শরীরের ভীষণ জ্বালা পোড়া করছে এবং হাত পা সব ঠান্ডা হয়ে আসছে। 

এসব শুনে পাহারাদার কোণ ভ্রুক্ষেপ করেনি এবং তাকে ঘুমিয়ে পরতে বললো। এলিজাবেথ কিছুক্ষন মন্ত্র পরলো এবং তারপর ঘুমিয়ে পরলো। পরদিন সকালে রুম থেকে তার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। এবং ক্যাথেডিক চার্চে তাকে দাফন করা হয়েছিল।

কিন্তু যেহুতু সে খুব ধনী পরিবারের মেয়ে ছিল তাই তার পরিবার থেকে সিন্ধান্ত নেয়াহয় তাকে স্কেট প্রাসাদের কবরস্থানে রাখা হবে। কিন্তু চার্চের কবর পুনরায় খোড়ার পর কফিন থেকে এলিজাবেথের দেহ খুঁজে পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ কফিনটি পুরো খালি ছিল। কোথায় তবে এলিজাবেথের মৃতদেহ? সে রহস্য আজও জানাযায়নি। আয়ারল্যেন্ডের একজন বিখ্যাত লেখক এলিজাবেথের জীবনী থেকে অনুপ্রেরনা পেয়ে ড্রাকুলা উপন্যাস রচনা করেছিলেন। 

Subscribe to our Newsletter

সম্পর্কিত আরো লেখা সমূহ