নূর ইনায়াত খান: একজন সাধারন কন্যা থেকে দুঃসাহসী গোয়েন্দা হয়ে উঠার গল্প

শেয়ার করুণ

Share on facebook
Share on twitter
Share on pinterest

১৯৪৩ সালের জুন মাসের ১৬ কিংবা ১৭ তারিখে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর দুটো বিমানে চড়ে দখলকৃত ফ্রান্সের উদ্দেশ্যে উড়ে চলেছেন বেশ কিছু স্পেশাল এজেন্ট। যাদের বলা হয় এসওই যার পুর্নরুপ হচ্ছে স্পেশাল অপারেশন্স এক্সিকিউটিভ।

সেই স্পেশাল এজেন্টদের একজন ছিলেন নূর ইনায়াত খান। ১৯১৪ তে জন্ম নেয়া নূর ইনায়াত খানের বাবা ছিলেন ইনায়াত খান যিনি ছিলেন সূফী সঙ্গীতের একজন বিশিষ্ট সাধক। পশ্চিমা সভ্যতায় সূফী ধারার সঙ্গীতের প্রচারের ক্ষেত্রে তাঁকেই পথপ্রদর্শক মানা হয়। ইনায়াত খান ছিলেন ভারতের মহীশুরের শাসক ‘টিপু সুলতান’-এর সরাসরি নাতি।

যাকে নিয়ে আমাদের আলোচনা সেই নূর ইনায়াত খানের গায়ে যে বিপ্লবের রক্ত বইছে, সেটা তার বংশ পরিচয়ই বলে দেয়। ১২ বছর বয়সেই তাকে জীবনের কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। বাবার অকাল মৃত্যুর পর মা ও তিন ভাই-বোনের ভরণপোষণের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

জীবনের প্রথম দিকে তিনি ম্যাগাজিন ও রেডিও প্রোগ্রামে কাজ করতেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি রেড ক্রসের নার্স হিসেবেও প্রশিক্ষণ নেন। তাঁর কাছের লোকেরা বলতো, “নূর-উন-নিসার দারুণ স্বপ্নালু এক জোড়া চোখ আছে”।

১৯৪০ সালে জার্মানরা অতর্কিতে ফ্রান্সে আক্রমণ করে বসলে নূর ইনায়াত পরিবার নিয়ে ২২ জুন পালিয়ে যান ইংল্যান্ডে। পলায়নের সময়টায় নূর ইনায়াত দেখেন জার্মানদের নিধনযজ্ঞ। শান্ত ও স্বপ্নালু চোখ দুটো জ্বলে ওঠে তাঁর। সেই গল্পই থাকবে আজকের লেখার বাকি অংশ জুড়ে।

১৯ নভেম্বর নূর ইনায়াত ইংল্যান্ডের ‘উইমেনস অক্সিলারি এয়ার ফোর্স (WAAF)’-এ ঢুকে পড়েন। সেখানে তাঁকে ট্রেনিং দেয়া হয় ‘ওয়্যারলেস অপারেটর’ হিসেবে। ১৯৪১ সালে WAAF হতে নূর ইনায়াতকে টেনে নেয় ‘স্পেশাল অপারেশন্স একজিকিউটিভ (SOE)’। সেখানে তাঁকে এক বছরেরও বেশী সময় ধরে প্রশিক্ষণ দেয়া হয় গুপ্তচরবৃত্তির উপরে। তাঁর কোডনেম হয় ‘নোরা বেকার’।

যাইহোক, ইনায়াত সহ কয়েকজন স্পেশাল এজেন্ট প্যারাসুট ল্যান্ডিং করেন ফ্রান্সেরউত্তরাঞ্চলে। তাঁদের সুপারভাইজর হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়‘হেনরি দেরিকোর্ত’ নামক আরেক এসওই এজেন্টকে, যিনি আগে থেকেই ফ্রান্সে অবস্থান করছিলেন।

নূর ইনায়াত সহ আরো দু’জন নারীকে প্যারিসে নিয়ে গিয়ে দেয়া হয় রেডিও অপারেটরের দায়িত্ব। পরবর্তী মাত্র দেড় মাসে গেস্টাপোর হাতে একে একে গ্রেফতার হয়ে যান নূর ইনায়াতের সমস্ত সহযোগী। তাঁর সুপারভাইজর হেনরি আত্মগোপন করেন। ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্স নূর ইনায়াতকে ইংল্যান্ডে ফেরত চলে আসতে বলে। কিন্তু নূর ইনায়াত ইংল্যান্ডে ফিরতে অস্বীকৃতি জানান। দলের সবাইকে হারিয়ে তিনি একাই একাই ফ্রান্সে তাঁর দায়িত্ব পালন করে যান।

গেস্টাপো জানতো এখনো একজন শত্রুপক্ষের ইঁদুরকে ধরা বাকি আছে। তাঁকে ধরতে গেস্টাপোর লোকজন হন্যে হয়ে প্যারিসের সমস্ত রাস্তা-ঘাট, বাস স্টেশন, রেল স্টেশন কড়া নজরদারিতে রাখে। নূর ইনায়াতের নাম চলে আসে গেস্টাপোর মোস্ট ওয়ান্টেডদের তালিকায়। এই সময়টায় নূর ইনায়াত প্রচণ্ড চাপের ভিতরে ছিলেন। ঐ সময়টায় প্যারিসে তিনিই ছিলেন একমাত্র ব্রিটিশ এজেন্ট। বাকি সবাই ধরা পড়ে গেছে।

অনেক দায়িত্ব তাঁর ঘাড়ে। একটা ভ্যানগাড়ি নিয়ে একা একা চলতেন প্যারিসের রাস্তায়। দিনের পর দিন ওই গাড়িতেই ঘুমাতেন। কোনো এক জায়গায় গাড়ি নিয়ে ২০ মিনিটের বেশি দাঁড়াতেন না। ভ্যানগাড়িতে বসেই রেডিও ইন্সট্রুমেন্ট দিয়ে ব্রিটেনের হেডকোয়ার্টারে প্যারিসের সমস্ত সংবাদ পৌঁছাতেন তিনি।

একসময় সুপারভাইজর হেনরি অজ্ঞাত স্থান হতে আবার যোগাযোগ করেন নূর ইনায়াতের সাথে। তাঁর অবস্থান কোথায় জেনে নেন হেনরি। এর কিছুদিন বাদেই, ১৯৪৩ সালের ১৩ অক্টোবর, গেস্টাপোর হাতে ধরা পড়ে যান নূর ইনায়াত।

এখন পর্যন্ত ইতিহাসবিদেরা বিশ্বাস করেন সুপারভাইজর ‘হেনরি দেরিকোর্ত’ ছিলেন আসলে একজন ডাবল এজেন্ট! তিনিই প্যারিসের সমস্ত ব্রিটিশ এজেন্টকে ধরিয়ে দিয়েছিলেন গেস্টাপোর হাতে। যদিও এখন পর্যন্ত কোনো অকাট্য প্রমাণ বা নথি-পত্র পাওয়া যায়নি এই মতবাদের সাপেক্ষে।

নূর ইনায়াত স্বভাবে শান্ত হলেও জার্মান গেস্টাপো অফিসারদের রিপোর্ট অনুযায়ী, তাঁকে গ্রেফতারে বেশ বেগ পেতে হয়েছিলো। ঘুষি মেরে দুজন গেস্টাপো অফিসারের নাক ফাটিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। পরে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলে চার-পাঁচজন সৈনিক মিলে তাঁকে জাপটে ধরে ফেলতে সক্ষম হয়। পরে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় প্যারিসের ‘৮৪ এভিনিউ ফশ’-এ।

সেখানে এক টর্চার সেলে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় তাঁকে। কিন্তু তিনি বিন্দুমাত্র মুখ খুলেননি। ২৫ নভেম্বর ১৯৪৩ সালে তিনি ঐ টর্চার সেল হতে পালানোর চেষ্টা করেন। পালাতে সমর্থও হন। কিন্তু পরে আবার ধরা পড়ে যান। ২৭ নভেম্বর আর কোনো ঝুঁকি না নিয়ে তাঁকে পাঠিয়ে দেয়া হয় জার্মানিতে বন্দীশিবিরে।

তাঁকে চালানের সময়ে কাগজের চালান তালিকায় তাঁর নামের পাশে লেখা ছিলো “অতি বিপজ্জনক”।ফলে কারাগারে তাঁকে শিকল আর বেড়ি পরিয়ে রাখা হয় ২৪ ঘণ্টা। বন্দীশিবিরের অকথ্য নির্যাতনেও নূর ইনায়াত পুরো ঠোঁট সেলাই করে রেখেছিলেন।

যদিও রাত নেমে এলে বেরিয়ে আসতো নূর ইনায়াতের আসল রূপ। ঐ বন্দীশিবিরে তাঁর পাশের সেলে থাকা কয়েকজন বন্দী স্বীকার করেছিলেন- রাত নেমে এলে সেলের দেয়াল চিরে তাদের কানে ভেসে আসতো নূর ইনায়াতের ফোঁপানো কান্নার শব্দ।

১৯৪৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর কারাগার কর্তৃপক্ষ যখন নিশ্চিত হয়ে যায়- আপাতদৃষ্টিতে শান্ত অথচ ভয়ংকর রকমের একরোখা এই ব্যক্তির থেকে কোনো তথ্যই বের করা যাবে না, তখন তাঁকে মৃত্যুদণ্ডের সিদ্ধান্ত দেয়া হয়।

১৯৪৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর নূর ইনায়াতকে ফায়ারিং স্কোয়াডে মাথার পেছনে গুলি করে হত্যা করা হয়।ইতিহাসে পাওয়া যায় গুলি চালানোর ঠিক আগে তিনি শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে চেঁচিয়ে বলে উঠেছিলেন, “লিবার্টি!!!”

Subscribe to our Newsletter

সম্পর্কিত আরো লেখা সমূহ

//graizoah.com/afu.php?zoneid=3546031