মানসা মুসাঃ ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ধনী সম্রাট

বলা হয়ে থাকে হজ্বে যাবার সময় মানসা মুসা প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার পাউন্ড ওজনের সোণা ব্যয় করেছিলেন। ইতিহাসবিদদের মতে তার মোট সম্পদ কতো ছিল তা সঠিক সংখ্যায় নির্নয় করা সম্ভব নয়। তাকে বলাহয় ইতিহাসের সেরা ধনী সম্রাট

যারা ইতিহাসপ্রিয় মানসা মুসা নামটির সঙ্গে হয়তো তাদের অনেকেই পরিচিত। তিনি ছিলেন মালির তিম্বাকতুর রাজা। তার সম্পর্কে প্রচলিত আছে নানারকম মিথ। এর কারন তিনি ছিলেন প্রচণ্ডরকম ধনী। বলা হয়ে থাকে তার কতো পরিমান সম্পদ ছিল তা বর্ণনা করা সম্ভব নয়। এমনকি তাবৎ ইতিহাসের সবচেয়ে ধনী ব্যাক্তি বলা হয় মানসা মুসাকে। 

তিনি শুধুমাত্র হজে যাবার সময় এতো টাকা দান করেছিলেন যে পুরো বিশ্বতে কয়েক বছর মুদ্রাস্ফীতি হয়ে যায়। আজ সেই অদ্ভুত ধনী সম্রাটের গল্প নিয়েই আমাদের আয়োজন। 

তিনি কতো বড় ধনী ছিলেন তা বোঝাতে কোন সঠিক সংখ্যা ব্যবহার করা সম্ভব নয়। মুসার সৈন্য-সামন্ত সম্পর্কে কথিত আছে, তার সেনাবাহিনীতে দুই লাখ সদস্য ছিল। সঙ্গে আরো ছিল ৪০ হাজার তিরন্দাজ। সেই সময় সেনাবাহিনীতে এতো বিপুল সৈন্য থাকা ছিল বিস্ময়কর ব্যাপার। এছাড়া সর্বকালের সেরা এই ধনী সম্রাটের জীবনযাপন এতোটাই বিলাসী ছিল যে, এ জন্য মিশরে একবার মুদ্রা সংকট ও দেখা দিয়েছিল। 

তিনি যে শুধু জাঁকজমক এবং বিলাসীতা করতেন এমন নয় তিনি অত্যন্ত ধার্মিক শাসক ও ছিলেন। তাই তার সময়ে প্রজারা মোটামুটি সুখেই দিন অতিবাহিত করেছে। মানবিক ছিলেন এই সোনার খনির মালিক। কখনো কাওকে খালি হাতে ফেরাতেন না। 

শিক্ষা-দীক্ষায় বিশেষ নজর ছিল মানসা মুসার। আরবি ভাষায় ছিল তার বিশেষ দক্ষতা। ইসলাম ধর্মের প্রচার ও প্রসারে ছিল তার প্রচন্ড আগ্রহ। সম্রাট বিশ্বাস করতেন ইসলামে প্রবেশ মানেই হচ্ছে একটি সভ্য সাংস্কৃতিক দুনিয়ায় পদার্পন। নিজের সাম্রাজ্যের ভিতর ধর্ম প্রসারের কাজেই বেশিরভাগ সময় ব্যাস্ত থাকতেন তিনি। 

ইসলাম ধর্মালম্বী সম্রাট মুসার হজ্ব পালন করাটা ইতিহাসের একটি বিখ্যাত ঘটনা। বেশ কিছু কারনে এটি খুব গুরুত্বপুর্ন। 

তার মক্কায় হজ্ব করতে যাওয়ার ঘটনা আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে খুবই আলোচিত হয়। ইতিহাস অনুযায়ী ১৩২৪-২৫ সালের মধ্যে হজ্ব করতে গিয়েছিলেন মুসা।

সেসময় তার সফর সঙ্গী ছিলেন প্রায় ৬০ হাজার মানুষ। এর ভিতর ১২ হাজার লোক ছিলেন শুধু মুসার সেবক। সম্রাটের প্রতিটি সেবকের সাথে ছিল সোনার বার। শুধু তাই নয়, বিশাল আয়োজনের এই সফরে ছিল ১০০টি উট। প্রতিটি উট প্রায় ১৪০ কেজি করে সোনা বহন করেছিল। যাত্রাপথে কয়েকশ কোটি মূল্যের সোনা বিতরন করেন এই সম্রাট। 

তিনি এতো বেশি সোণা বিতরন করেছিলেন যে, বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দেয়। কায়রো, মক্কা যেখানে সোনার দাম সবসময় চড়া সেখানে সোণার দাম একেবারেই নেমে গিয়েছিল। এতে শহর জুড়ে বেড়ে গিয়েচিল মুদ্রাস্ফীতি। পরিবারের লোকজনের মধ্যে তার এই যাত্রার সঙ্গী হন তার প্রথম স্ত্রী। 

এছাড়া সম্রাটের স্ত্রীর সেবায় নিযুক্ত ছিলেন আরও ৫০০শ সেবিকা। কাফেলায় বেশ কয়েকজন শিক্ষক, চিকিৎসক, সরকারী কর্মকর্তা, ও সম্রাটের মনোরঞ্জনের জন্য সংগীত শিল্পীও ছিলেন। এক সময় তিনি জ্ঞান বিজ্ঞানের চর্চার প্রতি দুর্বল হয়ে পরেন। তিনি বুঝতে পারেন শুধু অর্থ সম্পদ ই নয়, বরং আত্মার সন্তুষ্টি দিতে পারে শুধু জ্ঞান। তাই হজ্ব থেকে ফেরার পথে আরব সম্রাজ্য থেকে উট বোঝাই করে চিকিৎসা, জ্যোতির্বিদ্যা, দর্শন, ভূগোল, ইতিহাস, গনিত এবং আইন বিষয়ে প্রচুর বই নিয়ে আসেন। 

তাই বলাহয় তিনি সোণা নিয়ে গিয়েছিলেন হজ্ব পালনের উদ্দেশ্যে আর ফেরত আসেন জ্ঞান নিয়ে। বলা হয়ে থাকে ওই হজ্বে মুসা আজকের দিনের প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার পাউন্ড ওজনের সোণা ব্যয় করেছিলেন। যা সত্যিই অবিশ্বাস্য। ইতিহাসবিদরা তার এই হজ্ব সফরকে তাই ঐতিহাসিক বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *