রমজানে হওয়া ইসলামের ঐতিহাসিক ঘটনাবলী

রমজানে হওয়া ইসলামের ঐতিহাসিক ঘটনাবলী

শেয়ার করুণ

Share on facebook
Share on twitter
Share on pinterest

  •  

    রমজানে হওয়া ইসলামের ঐতিহাসিক ঘটনাবলী

মুসলিম ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী রমজান বছরের শ্রেষ্ঠ সময়। পবিত্রতম মাস। এই মাসে সিয়াম পালনের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের সাধনা করে মুসলিমরা। তবে এই সাধনা আধ্যাত্মিকতায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা বহুমাত্রিক। রমজানের ঐতিহাসিক কয়েকটি ঘটনা থেকে তা সহজেই প্রমাণিত হয়। নিম্নে রমজানে হওয়া ইসলামের ঐতিহাসিক ঘটনাবলী তুলে ধরা হলো—

বদর যুদ্ধ : 

ইসলামের ইতিহাসে প্রথম ও গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ বদর যুদ্ধ। দ্বিতীয় হিজরির ১৭ রমজান এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়। মদিনার নিকটবর্তী বদর নামক স্থানের সঙ্গে সংযুক্ত করে একে বদর যুদ্ধ বলা হয়। ৯৫০ জন সশস্ত্র কুরাইশ যোদ্ধার বিরুদ্ধে মাত্র ৩১৩ জন প্রায় নিরস্ত্র মুসলিম যোদ্ধা নিয়ে হজরত মুহাম্মদ (সা.) এই যুদ্ধে বিজয়ী হন। বদর যুদ্ধে বিজয়লাভের মাধ্যমে আরবে মদিনা রাষ্ট্র রাজনৈতিক স্বীকৃতি লাভ করে।মুসলিম ইতিহাসের প্রথম সশস্ত্র যুদ্ধ #বদর। দ্বিতীয় হিজরির ১৭ রমজান মদিনার উপকণ্ঠে বদর নামক স্থানে মুখোমুখি হয় মুসলিম ও কুরাইশ বাহিনী। ১৭ রমজান। ৬২৪ খ্রিস্টাব্দে তথা দ্বিতীয় হিজরির এই দিনে সংঘটিত হয়েছিল ইসলামে চিরস্মরণীয় ও গৌরবময় অধ্যায় #বদর যুদ্ধ। এটি ছিল সত্য ও মিথ্যার, হক ও বাতিলের, মুসলিম ও কাফেরদের মধ্যকার ঐতিহাসিক যুদ্ধ। এবং এটি ছিল ইসলামের প্রথম যুদ্ধ। মদিনার অদূরে অবস্থিত একটি কূপের নাম ছিল বদর। সেই সূত্রে এই কূপের নিকটবর্তী আঙিনাকে বলা হতো বদর প্রান্তর। এই বদর প্রান্তরেই মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় হাবিব নিরস্ত্র মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর সঙ্গীদের বিজয়ী করেছিলেন হাজার সশস্ত্র যোদ্ধার মোকাবেলায়।

©️লেখকঃ- মুহাঃমনিরুজ্জামান হিমেল

মক্কা বিজয় : 

ইসলামের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিজয়ও হয় রমজান মাসে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নেতৃত্বে অষ্টম হিজরির ২০ রমজান মুসলিম বাহিনী ঐতিহাসিক মক্কা নগরী বিজয় করে। একপ্রকার বিনা সংঘাতে, বিনা রক্তপাতে তিনি যুদ্ধ জয় করেন। মক্কা বিজয়ের ফলে ইসলামের প্রভাব-প্রতিপত্তি অভাবনীয় স্তরে উপনীত হয়। [কোরআনটাইম] সূরা নাসর আমাদের বিজয় কিংবা সাফল্য, কিসের উপর নির্ভরশীল? বিজয় বা সাফল্য মানুষের শক্তিমত্তার ওপর নির্ভর করে না। বিপুল শক্তিশালী দলও যুদ্ধে পরাজিত হয়। অন্যদিকে, দুর্বল দলও আল্লাহ’র সাহায্যক্রমে জয়ী হতে পারে। বদরের যুদ্ধ যার উৎকৃষ্ট প্রমাণ। শক্তিমত্তা নয়, বরং আল্লাহ’র সাহায্যই বিজয়ের একমাত্র নিয়ামক- এ কথাই সূরা নাসরে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন।

সূরা নাসর কোরআনের সর্বশেষ একদফায় পূর্ণাঙ্গভাবে অবতীর্ণ সূরা। অর্থাৎ, এরপর কোন সম্পূর্ণ সূরা একদফায় অবতীর্ণ হয়নি, অন্যান্য সূরার আয়াত নাযিল হয়েছে। [মুসলিম; ৩০২৪]

এই সূরার আয়াতসমূহ রাসুলুল্লাহ (সাঃ) কে উদ্দেশ্য করে বর্নিত। মক্কা বিজয়ের লক্ষণসমূহ পরিস্ফুট হয়ে ওঠা এবং এ বিজয়ের মাধ্যমে দুনিয়াতে রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর আগমন ও অবস্থানের উদ্দেশ্য পূর্ণ হয়ে যাওয়ার সমাছন্নতার পরিপ্রেক্ষিতে এই সূরাটি নাযিল হয়। ৬৩০ খ্রিস্টাব্দে মক্কা বিজয়ের পর দলে দলে মক্কার কাফিররা ইসলাম গ্রহণ করে। বিজয়ের মুহূর্তে আল্লাহ তাঁর রাসুল (সাঃ)-কে দুটি নির্দেশ দিয়েছেন। এবং নিজের একটি গুণের কথা পুনরুক্ত করেছেন। প্রথমটি হলো- আল্লাহ’র গুণকীর্তন করা যে, তিনি সবরকম দুর্বলতা বা দোষ থেকে মুক্ত (অর্থাৎ তিনি কারো সাহায্যের মুখাপেক্ষী নন)। দ্বিতীয়তঃ হলো- আল্লাহ’র কাছে ক্ষমা চাইতে বলা হয়েছে। অর্থাৎ তাওবা করতে বলা হয়েছে। পুনরুক্ত করে বলা হয়েছে যে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবা কবুলকারী।
আসুন ছোট এই সূরাটির অর্থ জেনে নেই-
১. إِذا جاءَ نَصرُ اللَّهِ وَالفَتحُ
“ইযা জা-আ নাছরুল্লা-হি ওয়াল ফাৎহু”
‘যখন আসবে আল্লাহর সাহায্য ও বিজয়।’
এ ব্যাপারে প্রায় সকলেই একমত যে, এখানে বিজয় বলতে মক্কা বিজয়কে বোঝানো হয়েছে। [মুয়াসসার, ইবনে কাসীর] আর বিজয় মানে কোন একটি সাধারণ যুদ্ধে বিজয় নয়। বরং এর মানে হচ্ছে এমন একটি চুড়ান্ত বিজয়, যার পরে ইসলামের সাথে সংঘর্ষ করার মতো আর কোন শক্তির অস্তিত্ব আরবের বুকে থাকবে না এবং একথাও সুস্পষ্ট হয়ে যাবে যে, আরবে এ দ্বীনটিই প্রাধান্য বিস্তার করে থাকবে।
২. وَرَأَيتَ النّاسَ يَدخُلونَ فى دينِ اللَّهِ أَفواجًا

অর্থাৎ লোকদের একজন দু’জন করে ইসলাম গ্ৰহণ করার যুগ শেষ হয়ে যাবে। তখন এমন এক যুগের সূচনা হবে যখন একটি গোত্রের সবাই এবং এক একটি বড় বড় এলাকার সমস্ত অধিবাসী কোন প্রকার যুদ্ধ-বিগ্রহ ও চাপ প্রয়োগ ছাড়াই স্বতস্ফুৰ্তভাবে মুসলিম হয়ে যেতে থাকবে। মক্কা বিজয়ের পূর্বে এমন লোকদের সংখ্যাও প্রচুর ছিল, যারা রাসূলুল্লাহ্ (সা:)-এর রেসালত ও ইসলামের সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত বিশ্বাসের কাছাকাছি পৌছে গিয়েছিল। কিন্তু কুরাইশদের ভয়ে অথবা অন্য কোন কারণে তারা ইসলাম গ্রহণ থেকে বিরত ছিল। মক্কাবিজয় তাদের সেই বাধা দূর করে দেয়। সেমতে তারা দলে দলে ইসলামে প্রবেশ করতে শুরু করে। সাধারণ আরবরাও এমনিভাবে দলে দলে ইসলামে দাখিল হয়। আমর ইবনে সালামাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, “মক্কা বিজয়ের পরে প্রতিটি গোত্রই রাসূলুল্লাহ্ (সা:)- এর কাছে এসে ঈমান আনার ব্যাপারে প্ৰতিযোগিতা শুরু করে। মক্কা বিজয়ের আগে এ সমস্ত গোত্রগুলো ঈমান আনার ব্যাপারে দ্বিধা করত। তারা বলত, তার ও তার গোত্রের অবস্থা পর্যবেক্ষণ কর। যদি সে তার গোত্রের উপর জয়লাভ করতে পারে তবে সে নবী হিসেবে বিবেচিত হবে”। [বুখারী; ৪৩০২]

৩. فَسَبِّح بِحَمدِ رَبِّكَ وَاستَغفِرهُ ۚ إِنَّهُ كانَ تَوّابًا
“ফাসাব্বিহ বিহাম্ দি রব্বিকা ওয়াস্তাগফির্হু, ইন্নাহূ কা-না তাউওয়া-বা”
‘তখন আপনি আপনার পালনকর্তার প্রশংসা সহ পবিত্রতা বর্ণনা করুন এবং তাঁর নিকটে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। নিশ্চয়ই তিনি অধিক তওবা কবুলকারী।’
অর্থাৎ, (হে রাসূল) বুঝে নিন যে, রিসালতের তবলীগ ও হক প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব যা আপনার উপর ছিল তা পূর্ণ হয়ে গেছে। এবার দুনিয়া থেকে আপনার বিদায় নেওয়ার পালা এসে গেছে। এ জন্য আপনি আল্লাহর তসবীহ, প্রশংসা এবং ক্ষমা প্রার্থনায় অধিকাধিক মনোযোগী হন।
সূরা নাসরের শিক্ষা:-
১. বিজয় আল্লাহর পক্ষ থেকে:-সকল বিজয় ও সাহায্য একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে। তিনি যখন চাইবেন। যে মাধ্যমে তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন। এবং যে উদ্দেশ্যের জন্য তিনি নির্ধারিত করবেন। সেসময়, সেই মাধ্যমে ও সেই উদ্দেশ্যে আল্লাহর পক্ষ থেকে এই সাহায্য ও বিজয় আসবে।
২. আল্লাহর প্রশংসা:- বিজয় ও সাহায্য আল্লাহর পক্ষ থেকে হওয়ার কারণেই আমাদের উচিত বেশি বেশি তার প্রশংসাসহ তাসবীহ পাঠ করা। পাশাপাশি বিজয়ের জন্য নিজেদের যোগ্যতার বৃদ্ধি ও তার পক্ষ থেকে সাহায্য চেয়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা উচিত।
৩. আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা:- বিজয়ের মুহূর্তে আনন্দে আত্মহারা না হয়ে এই সূরায় আল্লাহর প্রশংসা এবং নিজেদের অপূর্ণতা ও ত্রুটির জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে প্রার্থনা করার কথা বলা হয়েছে। কোন অত্যাচার বা শাস্তির মুখে পরাজিতরা কখনো পরিবর্তিত হয় না। সুতরাং, তাদের প্রতিও ক্ষমা ও দয়ার প্রদর্শনের এক সূক্ষ্ম ইঙ্গিত এই সূরায় প্রদান করা হয়েছে।পরিশেষে বলা যায়, আল্লাহ যখন আপনাকে আপনার শত্রুর উপর বিজয় দান করবেন। এবং আপনার শত্রুদের অপমানের জবাবে আপনাকে সম্মানিত করবেন। তখন সকল প্রকার গর্ব প্রকাশ থেকে বিরত থেকে একমাত্র আল্লাহর শোকর ও প্রশংসা করুন। পাশাপাশি নিজের ত্রুটি ও অপূর্ণতার জন্য তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। সকল বড়ত্ব ও গৌরবের একমাত্র অধিকারী তিনিই।
 

তুরের যুদ্ধ : 

উমাইয়া সেনাপতি আবদুর রহমান গাফিকির নেতৃত্বে ২ রমজান ১১৪ হিজরিতে দক্ষিণ ফ্রান্সের তুর নামক স্থানে ফ্রাংক ও বুরগুন্দীয় সেনাদের সঙ্গে এই যুদ্ধ হয়। উভয় পক্ষের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ হয় এবং শেষ পর্যন্ত মুসলিমরা পরাজিত হয়। ঐতিহাসিকরা বলেন, এই যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী বিজয়ী হলে ইউরোপের মানচিত্র পাল্টে যেত।

কর্ডোভা খিলাফতের প্রতিষ্ঠা : 

স্পেনের ঐতিহাসিক নগরী কর্ডোভাকে কেন্দ্র করে আবদুর রহমান বিন হিশাম কর্ডোভা খিলাফত প্রতিষ্ঠা করেন। ১৫ রমজান ১৩৮ হিজরিতে তিনি স্বাধীন কর্ডোভার আমির হন। ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে উমাইয়ারা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ছয় বছর পর বিদ্রোহীদের পরাজিত করে নতুন খেলাফত প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর শাসনামলে কর্ডোভার বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক অনেক উন্নয়ন হয়।

আইন জালুতের যুদ্ধ : 

২৫ রমজান ৬৫৮ হিজরিতে বর্তমান ইসরায়েলের দক্ষিণে অবস্থিত জলিল নামক স্থানে [ঈসা (আ.)-এর জন্মস্থান] মামলুক ও মোঙ্গলীয়দের মধ্যে এ ঐতিহাসিক যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী বিজয়ী হয় এবং মুসলিম বিশ্বে মোঙ্গলীয়দের ধ্বংসযাত্রা থেমে যায়।

আন্টিকিয়ার যুদ্ধ : 

হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর আমল থেকেই লেভান্ট থেকে আন্টিকিয়ার শহরগুলো মুসলমানদের শাসনাধীন ছিল। ৪৯৫-৪৯৬ হিজরিতে ক্রুসেডারদের হাতে মুসলিম শাসনের পতন হয়। এর ১৭০ বছর পর ৪ রমজান ৬৬৬ হিজরিতে সুলতান জহির বায়বার্সের নেতৃত্বে তা উদ্ধার করা হয়।

হাত্তিনের যুদ্ধ : 

২৫ রমজান ৫৮২ মতান্তরে ৫৮৩ হিজরি জেরুজালেমে ক্রুসেডার খ্রিস্টান রাজন্যবর্গ ও সুলতান সালাহ উদ্দিন আইয়ুবির মধ্যে যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী বিজয়ী হয় এবং জেরুজালেম উদ্ধার করা হয়।

রমজান যুদ্ধ : 

১০ রমজান (৬ অক্টোবর ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে) সুয়েজ খালের নিয়ন্ত্রণ ও অন্যান্য আঞ্চলিক ইস্যুতে আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে ইরাক, জর্দান, আলজেরিয়া, কিউবা, মরক্কো, তিউনিশিয়া, সৌদি আরব ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেও সরাসরি অংশ নেয় মিসর ও সিরিয়া। আরব জোট সুয়েজ খাল অতিক্রম করে ইসরায়েলের অধিকৃত অঞ্চলে অতর্কিত হামলা করে এবং প্রাথমিকভাবে তারা এগিয়েও থাকে। কিন্তু    যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সহযোগিতায় ইসরায়েলি বাহিনীর বিজয় হয়।

মানসা মুসাঃ ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ধনী সম্রাট

Subscribe to our Newsletter

সম্পর্কিত আরো লেখা সমূহ