সাম্প্রতিক বিলুপ্ত ৫টি প্রাণীর সর্বশেষ ছবি ও বিবরন

শেয়ার করুণ

Share on facebook
Share on twitter
Share on pinterest

বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে সাথে অনেক নতু উদ্ভিদ বা প্রাণীর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে। এবং একই সাথে এটাও জানতে পারছি একেবারে নিশ্চিন্ত হয়ে যাওয়া প্রজাতির কথা। বিশ্বে মানুষের সংখ্যা যত বাড়ছে প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া বাড়ছে সে অনুপাতে। 

জলবায়ু পরিবর্তন বা মানুষের স্বেচ্ছাচারিতা এসব কারনে বিলুপ্ত হয়ে গেছে বহু প্রাণী। আর কয়েক দশক আগে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া অনেক প্রাণীর সাক্ষি হয়ে রয়েছে শুধু কয়েকটি ছবি! এমনই বিলুপ্ত ৫টি প্রাণীর সবশেষ ছবি ও বিবরন নিয়ে আমাদের আজকের আয়োজন

লেসান রেইল

মাত্র ছয় ইঞ্চি লম্বা উড়ার ক্ষমতাহীন লেসান রেইল পাখিদের একসময় দেখা যেত লেসান দ্বীপে। প্রশান্ত মহসাগরের বুকে মাত্র চার বর্গ কিলোমিটারের এই বিচ্ছিন্ন দ্বিপটিতে এখনো অনেক বিপন্ন প্রজাটির বাস রয়েছে। কিন্তু বিংশ শতকের শুরুর দিক থেকেই এই লেসান রেইল পাখিটি বিলুপ্ত হতে শুরু করে।

ঠোট থেকে পেট পর্যন্ত হালকা ধুসর এবং পেছনের অংশে বাদামী রঙ্গের বিবর্ন এই পাখি বিবর্তনের অদ্ভুত এক নমুনা। উড়তে না পারার কারনে এদের পায়ের গঠন ছিল অপেক্ষাকৃত লম্বা এবং শক্তিশালী। 

বিভিন্ন ছোট ছোট প্রাণী ও কীটপতঙ্গ ছিল এদের খাবার। প্রাকৃতিক কোণ শত্রু না থাকায় এই পাখিটি ছিল ভিতিহীন। ১৮৯০ সাল থেকে সারের জন্য এই পাখির মল সংগ্রহ করা শুরু হয় এবং বেড়ে যায় মানুষের আনাগোনা। ১৯১০ সালে দ্বিপটিতে আমদানি হয় খরগোশের যারা দ্বীপের সমস্ত উদ্ভিদ সাবাড় করে দিতে শুরু করে। এতে খাদ্য সঙ্কটে পরে অস্তিত্তের সঙ্কটে পরতে থাকে লেসান রেইল।

১৯২৩ সালে এই দ্বীপে মাত্র কয়েক জোড়া পাখি টিকে ছিল। ১৯৪৩ সালে জাহাজের মাধ্যমে এই দ্বীপে প্রবেশ করে কালো ইঁদুরের যারা এই পাখির বিলুপ্তির জন্য যথেষ্ট ছিল। ১৯৪৪ সালে এই দ্বীপে সর্বশেষ লেসান রেইল পাখিটির দেখা পাওয়া যায়। আর তারপরই বিলুপ্ত হয়ে যায় পাখির এই বিরল প্রজাতিটী। 

বারবি সিংহ

মানুষের নির্মমতার শিকার হতে হয়েছে উত্তর আফ্রিকার এই সিংহ প্রজাতিটিকে। মাত্রারিক্ত শিকারের কারনে এই সিংহর আর কোণ প্রজাতি জীবিত নেই। একসময় মধ্য আফ্রিকার মরু অঞ্চলে অবাধে বিচরন করা এই সিংহ মিশরীয় সিংহ বা এটলাস সিংহ নামেও পরিচিত ছিল।

পুরুষ বারবি সিংহর বৈশিষ্ট্য ছিল এর ঘন এবং বড়বড় কেশর। যা অন্যান্য সিংহ থেকে একে আলাদা করেছিল। সাধারন আট থেকে দশ ফুট লম্বা হত এই সিংহ। আর ওজন ২৭০ থেকে ৩০০ কেজি। মূলত রোমান সম্রাজ্যর সময় থেকেই এই সিংহ কমে যেতে থাকে। গ্ল্যাডিয়েটরদের সাথে লড়াই বা খ্রিস্টানদের নিধনের জন্য এই সিংহ ধরা বা শিকার করা হতো।

কিন্তু বিঙ্গশ শতাব্দীতে শিকারিদের নিষ্ঠুরতায় বিলুপ্ত হতে থাকে এই প্রাণীটি। ১৯৪২ সালে সর্বশেষ সিংহটিকে গুলি করে মেরে ফেলা হয়। যদিও আলজেরিয়ায় এবং মরোক্কোতে ৬০এর দশকে এই সিংহর দেখা গিয়েছে বলে খবর পাওয়া যায়।  তবে বর্তমানে এই সিংহর আর কোন অস্তিত্ব নেই বলে মত দিয়েছেন গবেষকরা। ১৯২৫ সালে এটলাস পর্বতমালার উপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় একজন পাইলট বারবি সিংহর ছবিটি তুলতে সক্ষম হন। যা এই প্রজাতিটির মানুষের তোলা সর্বশেষ ছবি বলে বলা হয়ে থাকে। 

বেইজি ডলফিন

চীনের ইয়াঙ্গু নদীতে দেখা মিলতো সাধু পানির বিরল প্রজাতির এই ডলফিনের। কিন্তু খুব সম্প্রতি এই ডলফিনটি বিলুপ্ত হয়ে গেছে বলেই বিস্বাস করা হয়। প্রাচীন কাল থেকেই নিরাপত্তার দেবী হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে এই ডলফিন। কিন্তু ২০০২ সালে এই ডলফিনটির শেষ সদস্যটির ও মৃত্যু হয়।

আর ২০০৬ সালে চালনো এক অভিযানে নিশ্চিত হওয়া গেছে আর কোন বেইজি ডলফিন বেঁচে নেই এই বিশ্বে। ফসিল গবেষণা থেকে জানা গেছে আজ থেকে ২৫ মিলিয়ন বছর আগ থেকেই এই প্রাণীদের বিচরন ছিল । আর ২০ মিলিয়ন বছর আগে ইংগুন নদীতে অভিযোজিত হয় এই ডলফিন।

গড়ে সাত থেকে আট ফুট লম্বা এবং গড়ে ১৩৫ থেকে ২০০ কিঃগ্রা ওজনের পিঠের দিকটা ফ্যাকাসে নীল থেকে ধূসর এবং পেটের দিকটা সাদা। প্রানিটির গড় আয়ু ছিল ২৪ বছর। যদিও ছোট চোখের কারনে এদের চোখের দৃষ্টি শক্তি ক্ষীণ কিন্তু সোণার প্রযুক্তি ব্যবহার করে এরা চলাচল করতো। ১৯৮০ সালেও ইয়াঙ্গুন নদীতে প্রচুর সংখ্যায় দেখা মিলতো এদের। কিন্তু নগরায়ন, জল দূষণ ও মানুষের অবাধে শিকারের কারনে মাত্র ২০ বছরেই বিলুপ্ত হয়ে যায় এই ডলফিন। 

কাস্পিয়ান বাঘ

সাইবেরিয়ান এবং রয়েল বেঙ্গল টাইগারের মাঝামাঝি আকৃতির এই বাঘ এক সময় কাস্পিয়ান সাগরের পশ্চিম এবং দক্ষিন প্রান্তের ঘন অরন্যে বিচরন করে বেড়াত। ইরাক, আফগানিস্তান, তুরস্ক এবং মঙ্গোলিয়া, তাজাকিস্তান, কিরজিগস্তান সহ অনেক দেশের ঘন জংগলে একসময় রাজত্ব ছিল বিশালাকৃতির এই বাঘের।

স্থান ভেদে এই বাঘ বিভিন্ন নামে পরিচিত ছিল। যেমন হেরিকেরিয়ান বাঘ, পারস্য বাঘ, তুরানিয়ান বাঘ, বারবি মাঞ্জাদারান বাঘ নামে। গড়ে ১০ ফুটের লম্বা এই বাঘের ওজন ছিল ১৭০ থেকে ২৪০ কেজি। উনবিংশ শতাব্দীতেও এই কাস্পিয়ান বাঘের সংখ্যা ছিল উল্লেখযোগ্য। কিন্তু পরবর্তীতে চাষাবাদের জন্য বনভূমি উজার করা এবং মানুষের অতিরিক্ত শিকারের কারনে বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে ক্রমেই কমতে থাকে এই বাঘের সংখ্যা।

চীণের তারিন নদীর অববাহিকাতে ১৯২০ সালের দিকে এবং মালাসি নদীর অববাহিকা থেকে  ১৯৬০ সালে বিলুপ্ত হয়ে যায় এই বাঘ। কাজাখস্তানে ১৯৪৮ সালে, তুর্কি মিনিস্তানে ১৯৫৪ সালে, এবং ইরানের গুলছান এলাকায় ১৯৫৮ সালে সর্বশেষ দেখা যায় এই বাঘ। ১৯৭০ এর দশকের পর এই বাঘ পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে গেছে বলে মনা করা হয়েছে। বর্তমানে বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করছেন কাস্পিয়ান বাঘের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ সাইবেরিয়ান বাঘ মধ্য এশিয়ার কিছু জংগলে ছেড়ে দেয়ার। 

থাইলাসাইন

এটি তাসনামিয়ার বাঘ বা তাসনামিয়ার নেকড়ে নামেও পরিচিত। বিংশ শতকের গোড়ার দিক থেকে এই প্রাণীটি বিলুপ্ত হয়ে গেছে বলে বিশ্বাস গবেষকদের।

অস্ট্রেলিয়া মহাদেশ, তাসমানিয়া এবং নিউগিনিতে প্রচুর সংখ্যায় দেখা মিলতো থাইলেসাইন। আকারে মাঝারি বা বড় আকারে কুকুড়ের সমান এই নিশাচর শিকারি প্রাণীটির পিঠ থেকে লেজ পর্যন্ত বাঘের মতো ডোরাকাটা দাগ রয়েছে যে কারনে এটি তাসমানিয়ার বাঘ নামে পরিচিতি পেয়েছে।

তবে এই প্রাণীর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে পুরুষ এবং নারী উভয়ের ই ক্যাগকারুর মত থলি রয়েছে। প্রায় চার ফুটের মতো লম্বা প্রাপ্ত বয়স্ক থাইলেসাইনের উচ্চতা হতো দুই ফুটের মতো। এবং ওজন হতো বিশ থেকে ত্রিশ কেজি।

মানুষের কারনে প্রায় দুই হাজার বছর আগে থেকেই অস্ট্রেলিয়া এবং নিউগিনি থেকে নিশ্চিন্ত হয়ে যেতে থাকে থাইলেসাইন। ১৯৩০ সালের দিকেও তাসনামিয়ায় দেখা মিলতো এই প্রাণীর। ১৯৩০ সালে সর্বশেষ বন্য থাইলেসাইন কে গুলি করে হত্যা করা হয়। আর ১৯৩৬ সালে ৭ সেপ্টেম্বর হোবার চিড়িয়াখানায় শেষ থাইলেসাইন বংশধরের মৃত্যু হয় অবহেলাজনিত কারনে। 

এভাবেই মানুষের অপরিকল্পিত নগরায়ন, অতিরিক্তি শিকার ও পরিবেশ দূষণ ধীরে ধীরে বিলুপ্তির দিকে নিয়ে যাচ্ছে অসংখ্য প্রাণীর জীবন। একটা সময় যাদের রাজত্ব ছিল শুকনো মরুর বুক থেকে ঘন জঙ্গল অব্দি তারাই আজ কেওবা বিলুপ্ত আবার কেওবা বিলুপ্ত হবার পথে।

Subscribe to our Newsletter

সম্পর্কিত আরো লেখা সমূহ