সুপার পাওয়ার সোভিয়েত ইউনিয়ন উত্থান-পতনের ইতিহাস

শেয়ার করুণ

Share on facebook
Share on twitter
Share on pinterest
সোভিয়েত ইউনিয়নের ম্যাপ

সোভিয়েত ইউনিয়ন হচ্ছে সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের ধারন-বাহক’দের ঐক্য অথবা খুব সহজ ভাষায় বলতে গেলে সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল একটি একদলীয় রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদী দেশ। ১৯১৭ সালের ভ্লাদিমির লেনিন ও আলেকজান্ডার ভগদানব এর বলশেভিক পার্টির মধ্যদিয়ে প্রথমবারের মতো মার্ক্সবাদের ভিত্তিতে সমাজতান্ত্রিক দেশের গোড়াপত্তন হয় অক্টোবর বিপ্লবের মাধ্যমে; সারা বিশ্বে এই বিপ্লবকে কমিউনিষ্ট বিপ্লব বলা হয়।

১৯১৮ সাল থেকে ১৯২০ সাল পর্যন্ত গৃহযুদ্ধের কবলে থেকে ১৯২১ এক রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের সমাপ্তির মধ্য দিয়ে লেনিনের রেড আর্মির বিজয় সূচিত হয়। ১৯২২ সালে এক চুক্তির মধ্য দিয়ে রাশিয়ার পার্শ্ববর্তী কয়েকটি দেশ মিলে গড়ে উঠে সোভিয়েত ইউনিয়ন।ভৌগলিক পরিসীমায় রাশিয়ান সাম্রাজ্যের পরে যুক্ত হওয়া ঐক্য বিভিন্ন সময়ে তার পরিধি বাড়িয়েছে বা কমিয়েছে; তবে শেষপর্যন্ত এতোটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে বাল্টিক দেশগুলো সহ পূর্ব পোল্যান্ড ও সার্বিয়ার কিছু অংশও যুক্ত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর হারাতে হয়েছে পোল্যান্ড ও ফিনল্যান্ড। বর্তমান ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) কিছুটা ঠিক সেইরকমই; ইউনিয়নটি’র অস্তিত টিকে ছিলো ১৯২২ সাল থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত। যদিও ১৯৪৫ সাল থেকে ১৯৯১ সালে ভেঙে যাবার আগে পর্যন্ত সোভিয়েত ঐক্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী পরাশক্তি হিসেবে Cold War বা স্নায়ুযুদ্ধে লিপ্ত ছিল।

Whoever does not miss the Soviet Union has no heart. Whoever wants is back has no braion“- Vladimir Putin

অনেক চড়াই- উৎরাই আর ঠান্ডা-গরম পরিস্থিতি’র মধ্যে দিয়ে রাশিয়ার ক্ষমতা যখন কমতে থাকে, এক পর্যায়ে ১৯৯১ সালে এই ইস্টার্ন ইউরোপের দেশগুলো আবার বিভক্ত হয়ে যায়; সুপার পাওয়ার সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন আর বিশ্ব পেয়ে যায় নতুন ১৫টি নতুন রাষ্ট্রের।
সাল ১৯৮৯, দুই জার্মানীর মধ্যে থাকা বার্লিন প্রাচীর ভেঙে যাওয়ার পর পূর্ব ইউরোপের বহু দেশে কমিউনিজমেরও পতন ঘটতে থাকে। সোভিয়েত ইউনিয়ন তখনো কিন্তু টিকে ছিল; মিখাইল গর্বাচেব ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির নেতা। ১৯৯১ সালের আগস্টে তার বিরুদ্ধে এক ব্যর্থ অভ্যুত্থানের চেষ্টা করে কট্টরপন্থি কমিউনিস্টরা। ১৫টি সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রের অনেকগুলোতেই স্বাধীনতার আন্দোলন জোরদার হয়ে ওঠে।

প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন

(ক) বলসেভিক পার্টি কি?
বলশেভিক হচ্ছে মার্কসবাদী রাশিয়ান সোস্যাল ডেমোক্রেটিক লেবার পার্টির একটি উপদল; পরবর্তীতে তারা সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টিতে রূপান্তরিত হয়। ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবকালীন অক্টোবরের বিপ্লবের সময় রাশিয়ার ক্ষমতায় আসে এবং রাশিয়ান সোভিয়েত ফেডারেটিভ সোস্যালিস্ট রিপাবলিকের পত্তন করে যা পরবর্তীকালে ১৯২২ সালে গঠিত সোভিয়েত ইউনিয়নের মুখ্য প্রশাসনিক অঞ্চল হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। বলসেভিক পার্টির বিপ্লব, ফেব্রুয়ারি বিপ্লব ও অক্টোবর বিপ্লব নিয়ে আমরা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করবো।

(খ) ইষ্টার্ণ ইউরোপীয় ১৫টি রাষ্ট্রের নাম কি?
(১) আজারবাইজান (২) আর্মেনিয়া (৩) ইউক্রেন (৪) এস্তোনিয়া (৫) উজবেকিস্তান (৬) কাজাখস্তান (৭) কিরগিজিস্তনা (৮) জর্জিয়া (৯) তাজিকিস্তান (১০) তুর্কেমেনিস্তান (১১) বেলারুশ (১২) মলদোভা (১৩) রাশিয়া (১৪) লাটভিয়া (১৫) লিথুয়ানিয়া

রাশিয়ার জার শাসনামল

“জারদের প্রতিষ্ঠাতা তৃতীয় ইভান”

সোভিয়েত ইউনিয়নের ইতিহাস জানতে হলে আমাদের আগে জেনে নিতে হবে রাশিয়ার জার শাসনামলের কথা; রাশিয়ার জার শাসনামল না জানা থাকলে যদি প্রশ্ন করা হয় রুশ বিপ্লবের প্রেক্ষাপট কি? এই প্রশ্নে কমিউনিষ্ট নেতাও হিমশিম খেয়ে যান! সোভিয়েত ইউনিয়ন বলতে আমাদের অনেকের কাছে ১৯১৭-এর রুশ বিপ্লব ছাড়া আর মাথায় কিছুই আসে না; যেই বিপ্লবের মাধ্যমে একনায়ক স্বৈরাচারী জার সরকারের পতন ঘটিয়ে সমাজতন্ত্রের পতাকা উড়ানো হয়।

অথচ এই জার শাসন সম্পর্কে আমরা কতটুকুই বা জানি? কেউ কেউ মনে করেন যে জার ছিল একজন ব্যক্তি, আবার যারা ভালো ভাবে জানার চেষ্টা করেছেন তাদের অনেকেই জার সাম্রাজ্যের পেছনের ইতিহাসটুকু ইতিহাস হিসেবেই পেছনে ফেলে এসেছেন। গতানুগতিক ধারার ইতিহাসে গুটিকয়েকজন জার ছাড়া বাকিদের বর্ণনা একদম উধাও।

১৩ শতকের শেসদিকে রাশিয়ান অঞ্চলে মঙ্গোলদের প্রভাব বাড়তেই থাকে। মঙ্গোল সম্রাট বাতু খানের হাতে রাশিয়ান শাসক তাদের গুরুত্বপূর্ন অঞ্চলগুলো হারতে থাকে এবং এর ফলে ক্ষমতা একপর্যায়ে তাদের নিজস্ব প্রভাবাধীন ও অত্যন্ত সংকীর্ণ হয়ে পরে। এই পরিস্থিতিতে একের পর এক শাসক পরিবর্তন হয় অথচ তাদের অবস্থার কোন উন্নতি হয় নি।

গ্র্যান্ড ডিউক ইভান রাশিয়ার সীমানা সম্প্রসারিত করার উদ্যোগ নেন তিনি তাতারদের বিতাড়িত করেন এবং সীমানা সম্প্রসারণের কাজে মনোনিবেশ করেন। পরবর্তী সময়ে ১৫০৩ সালে ক্ষমতায় আসেন ভ্যাসেল-৩। তার সময়ে মস্কো আয়তন ও ক্ষমতায় আরো প্রভাবশালী হয়ে উঠতে থাকে। সাল ১৫৩৩, ক্ষমতায় আসেন তৃতীয় ইভান! এই ইভানই প্রবর্তন করেন জার সাম্রাজ্যের। ১৫৪৭ সালে তৃতীয় ইভান নিজেকে জার (‘জার’ শব্দের বাংলা অর্থ হল সম্রাট) হিসেবে ঘোষণা করেন। তার পরবর্তী সময়ের শাসকগণ তার পদাঙ্ক অনুসরণ করে জার উপাধি গ্রহণ করে ফলে তাদের শাসক বংশই ইতিহাসে জার হিসেবে জায়গা দখল করে নেয়।

জারদের প্রতিষ্ঠাতা তৃতীয় ইভানও ক্ষমতা গ্রহণের পর রাজ্য সীমা সম্প্রসারণে মননিবেশ করেন। তিনি মঙ্গোলদের অধিকৃত অঞ্চলে মস্কোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন; তৃতীয় ইভানের রণকৌশল ও নেতৃত্বের মাধ্যমে সুইডিশ ও পলিশদের পরাজিত করেন এবং মস্কোকে আধুনিক করে গড়ে তোলেন। তৃতীয় ইভান মৃত্যুবরণ করেন ১৫৮১ সালে; মৃত্যুর পূর্বে তিনি আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে যান সাইবেরিয়া ও ইউরোপের সীমানা পর্যন্ত।

তৃতীয় ইভানের পরবর্তীতে ক্ষমতায় আসেন ফিউডর; ফিউডর ততটা সফল শাসক ছিলেন না; ফিউডর ক্ষমতায় থাকেন ১৫৯৮ সাল পর্যন্ত । তার মৃত্যুর পর ক্ষমতায় আসেন ১ম বরিস তিনিও অপেক্ষাকৃত দুর্বল শাসক ছিলেন। তিনি ১৬০৫ সালে মৃত্যুবরণ করলে ক্ষমতায় আসেন তার নাবালক পুত্র ২য় ফিউডর। কিন্ত তাকে দুর্বৃত্তরা হত্যা করলে জার সাম্রাজ্যে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পরে। উত্তপ্ত এই পরিস্থিতিতে ক্ষমতায় আসেন ২য় দীমিত্রী; পরিস্থিতি মোকাবেলায় তিনিও সম্পূর্ণ ব্যর্থ হন যার ফলে সমগ্র রাশিয়ায় ছড়িয়ে পরে অর্থনৈতিক মন্দা, খাদ্য সঙ্কট, হানাহানি, মারামারি, সন্ত্রাসী কার্যকলাপ ও নানা ধরনের রোগ, পার্শ্ববর্তী শাসকদের আক্রমণ, ফলে সম্পুর্ণ পরিস্থিতি চলে যায় শাসকের নিয়ন্ত্রণের বাহিরে! এরকম পরিস্থিতিতে প্রিন্স পুজারস্কি ও কোজমানিনের নেতৃত্বে ১৬১২ সালে গড়ে উঠে জাতীয় ঐক্য!

(বাকি অংশ ২য় পর্বে)

Subscribe to our Newsletter

সম্পর্কিত আরো লেখা সমূহ